নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কৃষকের দিনের বড় একটি সময় ধানের জমিতে অতিবাহিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সময় কাটছে সার বিক্রির দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সার একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো দোকানে ইউরিয়া থাকলে মিলছে না ডিএপি, আবার কোথাও ডিএপি থাকলেও নেই এমওপি। ফলে এক ধরনের সার নিতে এক দোকানে, আরেক ধরনের সার সংগ্রহ করতে যেতে হচ্ছে অন্য দোকানে। এতে সময়ের পাশাপাশি বাড়ছে যাতায়াতের খরচ ও ভোগান্তি।
গত কয়েকদিনে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বদলগাছী সদর ইউনিয়নের শাওন ট্রেডার্সের সামনে দেখা যায় কৃষকদের দীর্ঘ সারি। শুধু ওই দোকানেই নয়, উপজেলার বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টেও সাম্প্রতিক সময়ে এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তাঁদের প্রশ্ন আমন মৌসুমে যখন জমিতে সময়মতো সার প্রয়োগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তখন প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতেই যদি দিনের বড় সময় চলে যায়, তাহলে মাঠের কাজ করবে কখন?
সদর ইউনিয়নের আনোয়ার হোসেন ও টগর নামের দুইজন কৃষক বলেন, সার যদি থাকে, তাহলে প্রয়োজনের সময় একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না কেন? ইউরিয়া এক জায়গায়, ডিএপি আরেক জায়গায় এভাবে ঘুরতে হচ্ছে। আমন মৌসুমের শুরুতেই কৃষকের জন্য পর্যাপ্ত সার নিশ্চিত করা দরকার।
সার নিতে আসা কৃষক সানোয়ারের ভাষ্যমতে, তাঁদেরও জমিতে থাকার কথা। কিন্তু সার সংগ্রহ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, একদিকে ফসলের ন্যায্য দাম নিয়ে হতাশা,অন্যদিকে সার সংগ্রহের ভোগান্তি, দুই দিক থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছেন তাঁরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে সমস্যাটি শুধু সার না পাওয়ার নয়। বরং প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের সার একই সময়ে একই জায়গা থেকে না পাওয়াও বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন কৃষকের জমিতে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি প্রয়োজন হলেও তিন ধরনের সার একসঙ্গে না পেয়ে তাঁকে একাধিক দোকানে যেতে হচ্ছে। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, সার সরবরাহ যদি পর্যাপ্ত থাকে তাহলে কেন ডিলারভেদে একেক ধরনের সার পাওয়া যাচ্ছে এ বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বদলগাছী উপজেলায় ১০টি বিসিআইসি ও ১৯টি বিএডিসি সার ডিলার রয়েছেন। উপজেলার আট ইউনিয়নের ৭২টি ওয়ার্ডে রয়েছে ৭২টি খুচরা সার বিক্রয়কেন্দ্র।
চলতি বছরে উপজেলায় ইউরিয়ার বার্ষিক চাহিদা ৬ হাজার ২৯০ মেট্রিক টন, টিএসপি ১ হাজার ৬১৮ মেট্রিক টন, ডিএপি ৪ হাজার ১০০ মেট্রিক টন এবং এমওপি ২ হাজার ৪৮০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চলতি মাসে ইউরিয়া ৩১২ মেট্রিক টন, টিএসপি ১৮৮ মেট্রিক টন, ডিএপি ৩৩৩ মেট্রিক টন এবং এমওপি ২৮০ মেট্রিক টন বরাদ্দ রয়েছে।
এতসংখ্যক ডিলার ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থাকার পরও কৃষকদের কেন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে এবং কেন প্রয়োজনীয় সব ধরনের সার একই সময়ে পাওয়া যাচ্ছে না এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
এরই মধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগও করেছেন কয়েকজন কৃষক। তাঁদের দাবি, কোথাও কোথাও বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। তবে কৃষি বিভাগের দাবি উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই।
দীর্ঘ লাইনের বিষয়ে বদলগাছী সদরের শাওন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শামসুল হক বলেন, গতকাল আমাদের ডিলার পয়েন্ট থেকে কৃষকদের ডিএপি ও এমওপি সার দেওয়া হয়েছে। তবে কৃষকদের চাহিদা বেশি ইউরিয়া সারের জন্য। এ কারণেই মূলত দীর্ঘ লাইন হয়েছে। ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি একসঙ্গে পেলে এমন লাইন থাকত না। অক্টোবরের বরাদ্দ থেকে চলতি মাসে সার দেওয়া হচ্ছে।
আরেক ডিলার আলম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মাসুদ করিম বলেন, গতকাল সারের জন্য দীর্ঘ লাইন ছিল এটা সত্য। তবে আজ সকাল থেকেই ইউরিয়া সার দেওয়া হয়েছে। ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি একসঙ্গে বরাদ্দ পাওয়া গেলে কৃষকদের এমন ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।
বদলগাছী উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. মেহেদী হাসান বলেন, সারের কোনো সংকট নেই। সদর ইউনিয়নে চলতি বছর প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। গতকাল সদর ইউনিয়নে সারের জন্য দীর্ঘ লাইন হয়েছিল। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বিষয়টি নজরদারি করা হচ্ছে। আশা করছি, আগামীতে এ ধরনের দীর্ঘ লাইন থাকবে না।
বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান ছনি বলেন, কৃষকের ভোগান্তি কমাতে সাপাহার উপজেলা থেকে অতিরিক্ত ৭০ মেট্রিক টন সার আনা হয়েছে। কৃষকদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি ডিলার পয়েন্টে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রতিনিধিকে উপস্থিত থেকে সার বিতরণের জন্য বলা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী সার বিতরণ করা হচ্ছে।

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কৃষকের দিনের বড় একটি সময় ধানের জমিতে অতিবাহিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সময় কাটছে সার বিক্রির দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সার একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো দোকানে ইউরিয়া থাকলে মিলছে না ডিএপি, আবার কোথাও ডিএপি থাকলেও নেই এমওপি। ফলে এক ধরনের সার নিতে এক দোকানে, আরেক ধরনের সার সংগ্রহ করতে যেতে হচ্ছে অন্য দোকানে। এতে সময়ের পাশাপাশি বাড়ছে যাতায়াতের খরচ ও ভোগান্তি।
গত কয়েকদিনে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বদলগাছী সদর ইউনিয়নের শাওন ট্রেডার্সের সামনে দেখা যায় কৃষকদের দীর্ঘ সারি। শুধু ওই দোকানেই নয়, উপজেলার বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টেও সাম্প্রতিক সময়ে এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তাঁদের প্রশ্ন আমন মৌসুমে যখন জমিতে সময়মতো সার প্রয়োগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তখন প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতেই যদি দিনের বড় সময় চলে যায়, তাহলে মাঠের কাজ করবে কখন?
সদর ইউনিয়নের আনোয়ার হোসেন ও টগর নামের দুইজন কৃষক বলেন, সার যদি থাকে, তাহলে প্রয়োজনের সময় একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না কেন? ইউরিয়া এক জায়গায়, ডিএপি আরেক জায়গায় এভাবে ঘুরতে হচ্ছে। আমন মৌসুমের শুরুতেই কৃষকের জন্য পর্যাপ্ত সার নিশ্চিত করা দরকার।
সার নিতে আসা কৃষক সানোয়ারের ভাষ্যমতে, তাঁদেরও জমিতে থাকার কথা। কিন্তু সার সংগ্রহ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, একদিকে ফসলের ন্যায্য দাম নিয়ে হতাশা,অন্যদিকে সার সংগ্রহের ভোগান্তি, দুই দিক থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছেন তাঁরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে সমস্যাটি শুধু সার না পাওয়ার নয়। বরং প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের সার একই সময়ে একই জায়গা থেকে না পাওয়াও বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন কৃষকের জমিতে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি প্রয়োজন হলেও তিন ধরনের সার একসঙ্গে না পেয়ে তাঁকে একাধিক দোকানে যেতে হচ্ছে। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, সার সরবরাহ যদি পর্যাপ্ত থাকে তাহলে কেন ডিলারভেদে একেক ধরনের সার পাওয়া যাচ্ছে এ বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বদলগাছী উপজেলায় ১০টি বিসিআইসি ও ১৯টি বিএডিসি সার ডিলার রয়েছেন। উপজেলার আট ইউনিয়নের ৭২টি ওয়ার্ডে রয়েছে ৭২টি খুচরা সার বিক্রয়কেন্দ্র।
চলতি বছরে উপজেলায় ইউরিয়ার বার্ষিক চাহিদা ৬ হাজার ২৯০ মেট্রিক টন, টিএসপি ১ হাজার ৬১৮ মেট্রিক টন, ডিএপি ৪ হাজার ১০০ মেট্রিক টন এবং এমওপি ২ হাজার ৪৮০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চলতি মাসে ইউরিয়া ৩১২ মেট্রিক টন, টিএসপি ১৮৮ মেট্রিক টন, ডিএপি ৩৩৩ মেট্রিক টন এবং এমওপি ২৮০ মেট্রিক টন বরাদ্দ রয়েছে।
এতসংখ্যক ডিলার ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থাকার পরও কৃষকদের কেন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে এবং কেন প্রয়োজনীয় সব ধরনের সার একই সময়ে পাওয়া যাচ্ছে না এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
এরই মধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগও করেছেন কয়েকজন কৃষক। তাঁদের দাবি, কোথাও কোথাও বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। তবে কৃষি বিভাগের দাবি উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই।
দীর্ঘ লাইনের বিষয়ে বদলগাছী সদরের শাওন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শামসুল হক বলেন, গতকাল আমাদের ডিলার পয়েন্ট থেকে কৃষকদের ডিএপি ও এমওপি সার দেওয়া হয়েছে। তবে কৃষকদের চাহিদা বেশি ইউরিয়া সারের জন্য। এ কারণেই মূলত দীর্ঘ লাইন হয়েছে। ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি একসঙ্গে পেলে এমন লাইন থাকত না। অক্টোবরের বরাদ্দ থেকে চলতি মাসে সার দেওয়া হচ্ছে।
আরেক ডিলার আলম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মাসুদ করিম বলেন, গতকাল সারের জন্য দীর্ঘ লাইন ছিল এটা সত্য। তবে আজ সকাল থেকেই ইউরিয়া সার দেওয়া হয়েছে। ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি একসঙ্গে বরাদ্দ পাওয়া গেলে কৃষকদের এমন ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।
বদলগাছী উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. মেহেদী হাসান বলেন, সারের কোনো সংকট নেই। সদর ইউনিয়নে চলতি বছর প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। গতকাল সদর ইউনিয়নে সারের জন্য দীর্ঘ লাইন হয়েছিল। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বিষয়টি নজরদারি করা হচ্ছে। আশা করছি, আগামীতে এ ধরনের দীর্ঘ লাইন থাকবে না।
বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান ছনি বলেন, কৃষকের ভোগান্তি কমাতে সাপাহার উপজেলা থেকে অতিরিক্ত ৭০ মেট্রিক টন সার আনা হয়েছে। কৃষকদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি ডিলার পয়েন্টে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রতিনিধিকে উপস্থিত থেকে সার বিতরণের জন্য বলা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী সার বিতরণ করা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন