জয়পুরহাট    শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
Daily Joypur Barta

গবাদিপশু পালন

দুই গাভী থেকে খামার,শাকিলের সাফল্যে অনুপ্রাণিত ৪০ তরুণ



দুই গাভী থেকে খামার,শাকিলের সাফল্যে অনুপ্রাণিত ৪০ তরুণ
ছবি- প্রতিনিধি

সংসারে অভাব ছিল, কাঁধে ছিল পরিবারের দায়িত্ব। বৃদ্ধ বাবা-মা, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা আর পরিবারের ভরণপোষণ সবকিছু সামলাতে গিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হয়নি জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার শাকিল তালুকদারের (২৯)। 

এইচএসসি পাসের পরই তাঁকে নামতে হয় উপার্জনের লড়াইয়ে। তবে প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি। প্রশিক্ষণ, পরিশ্রম আর নিজের প্রতি বিশ্বাসকে পুঁজি করে শুরু করেন গবাদিপশু পালন। 

দুটি গাভি ও ছয়টি ছাগল নিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন বিস্তৃত হয়েছে কৃষি, মাছ চাষ ও সবজি উৎপাদনে। তাঁর খামারে বর্তমানে কাজ করছেন ১২ জন শ্রমিক। আর তাঁর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে একই গ্রামের প্রায় ৪০ জন তরুণও নিজেদের কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে নিয়েছেন।

শাকিলের বাড়ি ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের নাজিরপুর গ্রামে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে এইচএসসি পাসের পর আর পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। 

সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর মেজ ভাই একটি দোকানে কাজ করেন। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে শাকিল বুঝতে পারেন,নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে হবে।সেই ভাবনা থেকেই ২০২১ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও গবাদিপশু পালনের প্রশিক্ষণ নেন তিনি। 

২০২৩ সালে একই অধিদপ্তর থেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রশিক্ষণও নেন। প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া জ্ঞান কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শাকিল। যুব ঋণসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে অল্প পরিসরে শুরু করেন গবাদিপশু পালন।

শুরুতে তাঁর খামারে ছিল দুটি গাভি ও ছয়টি ছাগল। গাভির দুধ বিক্রি করে যে আয় হতো, তা থেকে আবার খামারে বিনিয়োগ করতেন। এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাঁর উদ্যোগের পরিধি। 


বর্তমানে খামারে রয়েছে ১২টি গাভি ও ১০টি ছাগল। এর পাশাপাশি প্রায় তিন একর জমিতে আখ, মরিচ, টমেটো, ধান, ওলকচু, লাউ, মিষ্টিকুমড়া ও লতিরাজ কচুসহ বিভিন্ন ফসল ও শাকসবজির চাষ করছেন। দুটি পুকুরে করছেন মাছ চাষ। এসব উদ্যোগে বর্তমানে ১২ জন শ্রমিক কাজ করছেন।


শাকিলের উদ্যোগের প্রভাব পড়েছে তাঁর নিজের পরিবারের বাইরেও। তাঁকে কাছ থেকে কাজ করতে দেখে গ্রামের অনেক তরুণ কৃষি ও খামারভিত্তিক কাজে আগ্রহী হয়েছেন। তাঁদের কেউ সবজি চাষ করছেন, কেউ মাছ চাষ করছেন, আবার কেউ কৃষিকে কেন্দ্র করে নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। এভাবে শাকিলকে অনুসরণ করে গ্রামের প্রায় ৪০ জন তরুণ কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছেন বলে জানা গেছে।


নাজিরপুর গ্রামের মো. কবির হোসেন, আব্দুল গফুর ও শহীদ আলী বলেন, শাকিলকে দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হয়েছি। তাঁর পরিকল্পনা ও কাজের ধরন অনুসরণ করে আমরাও সবজি ও মাছ চাষ শুরু করেছি। তাঁকে দেখে বুঝেছি, চেষ্টা করলে গ্রামেও নিজের পায়ে দাঁড়ানো সম্ভব। শাকিল আমাদের গ্রামের একজন সফল উদ্যোক্তা। তাঁকে নিয়ে আমরা গর্বিত।


কৃষি ও খামার পরিচালনার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত শাকিল। তিনি আলমপুর ইউনিয়ন আনসার ও ভিডিপির দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আনসার সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও অংশ নেন তিনি। নিজের জীবনে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি সমাজের মানুষের জন্য কাজ করার মধ্যেও খুঁজে পান আত্মতৃপ্তি।


শাকিলের সাফল্যের পেছনে প্রশিক্ষণ ও পরিশ্রমের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন জেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক। তিনি বলেন, শাকিল অত্যন্ত পরিশ্রমী একজন যুবক। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সেই জ্ঞান বাস্তবে কাজে লাগিয়েছেন এবং একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আমরা তাঁর আরও উন্নতি কামনা করি।


শাকিলের পথচলা দেখায়, কর্মসংস্থানের জন্য শুধু চাকরির অপেক্ষায় বসে না থেকে দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে নিজেও উদ্যোগী হওয়া সম্ভব। তবে এ পথে প্রয়োজন পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও ধৈর্য। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে শুরু করা তাঁর উদ্যোগ আজ নিজের পরিবারের জীবিকার অবলম্বন হওয়ার পাশাপাশি অন্য তরুণদেরও অনুপ্রাণিত করছে।


আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬


দুই গাভী থেকে খামার,শাকিলের সাফল্যে অনুপ্রাণিত ৪০ তরুণ

প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সংসারে অভাব ছিল, কাঁধে ছিল পরিবারের দায়িত্ব। বৃদ্ধ বাবা-মা, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা আর পরিবারের ভরণপোষণ সবকিছু সামলাতে গিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হয়নি জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার শাকিল তালুকদারের (২৯)। 

এইচএসসি পাসের পরই তাঁকে নামতে হয় উপার্জনের লড়াইয়ে। তবে প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি। প্রশিক্ষণ, পরিশ্রম আর নিজের প্রতি বিশ্বাসকে পুঁজি করে শুরু করেন গবাদিপশু পালন। 

দুটি গাভি ও ছয়টি ছাগল নিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন বিস্তৃত হয়েছে কৃষি, মাছ চাষ ও সবজি উৎপাদনে। তাঁর খামারে বর্তমানে কাজ করছেন ১২ জন শ্রমিক। আর তাঁর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে একই গ্রামের প্রায় ৪০ জন তরুণও নিজেদের কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে নিয়েছেন।

শাকিলের বাড়ি ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের নাজিরপুর গ্রামে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে এইচএসসি পাসের পর আর পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। 

সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর মেজ ভাই একটি দোকানে কাজ করেন। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে শাকিল বুঝতে পারেন,নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে হবে।সেই ভাবনা থেকেই ২০২১ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও গবাদিপশু পালনের প্রশিক্ষণ নেন তিনি। 

২০২৩ সালে একই অধিদপ্তর থেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রশিক্ষণও নেন। প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া জ্ঞান কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শাকিল। যুব ঋণসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে অল্প পরিসরে শুরু করেন গবাদিপশু পালন।

শুরুতে তাঁর খামারে ছিল দুটি গাভি ও ছয়টি ছাগল। গাভির দুধ বিক্রি করে যে আয় হতো, তা থেকে আবার খামারে বিনিয়োগ করতেন। এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাঁর উদ্যোগের পরিধি। 


বর্তমানে খামারে রয়েছে ১২টি গাভি ও ১০টি ছাগল। এর পাশাপাশি প্রায় তিন একর জমিতে আখ, মরিচ, টমেটো, ধান, ওলকচু, লাউ, মিষ্টিকুমড়া ও লতিরাজ কচুসহ বিভিন্ন ফসল ও শাকসবজির চাষ করছেন। দুটি পুকুরে করছেন মাছ চাষ। এসব উদ্যোগে বর্তমানে ১২ জন শ্রমিক কাজ করছেন।


শাকিলের উদ্যোগের প্রভাব পড়েছে তাঁর নিজের পরিবারের বাইরেও। তাঁকে কাছ থেকে কাজ করতে দেখে গ্রামের অনেক তরুণ কৃষি ও খামারভিত্তিক কাজে আগ্রহী হয়েছেন। তাঁদের কেউ সবজি চাষ করছেন, কেউ মাছ চাষ করছেন, আবার কেউ কৃষিকে কেন্দ্র করে নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। এভাবে শাকিলকে অনুসরণ করে গ্রামের প্রায় ৪০ জন তরুণ কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছেন বলে জানা গেছে।


নাজিরপুর গ্রামের মো. কবির হোসেন, আব্দুল গফুর ও শহীদ আলী বলেন, শাকিলকে দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হয়েছি। তাঁর পরিকল্পনা ও কাজের ধরন অনুসরণ করে আমরাও সবজি ও মাছ চাষ শুরু করেছি। তাঁকে দেখে বুঝেছি, চেষ্টা করলে গ্রামেও নিজের পায়ে দাঁড়ানো সম্ভব। শাকিল আমাদের গ্রামের একজন সফল উদ্যোক্তা। তাঁকে নিয়ে আমরা গর্বিত।


কৃষি ও খামার পরিচালনার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত শাকিল। তিনি আলমপুর ইউনিয়ন আনসার ও ভিডিপির দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আনসার সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও অংশ নেন তিনি। নিজের জীবনে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি সমাজের মানুষের জন্য কাজ করার মধ্যেও খুঁজে পান আত্মতৃপ্তি।


শাকিলের সাফল্যের পেছনে প্রশিক্ষণ ও পরিশ্রমের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন জেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক। তিনি বলেন, শাকিল অত্যন্ত পরিশ্রমী একজন যুবক। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সেই জ্ঞান বাস্তবে কাজে লাগিয়েছেন এবং একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আমরা তাঁর আরও উন্নতি কামনা করি।


শাকিলের পথচলা দেখায়, কর্মসংস্থানের জন্য শুধু চাকরির অপেক্ষায় বসে না থেকে দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে নিজেও উদ্যোগী হওয়া সম্ভব। তবে এ পথে প্রয়োজন পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও ধৈর্য। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে শুরু করা তাঁর উদ্যোগ আজ নিজের পরিবারের জীবিকার অবলম্বন হওয়ার পাশাপাশি অন্য তরুণদেরও অনুপ্রাণিত করছে।



Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত