জয়পুরহাট    মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
Daily Joypur Barta

তারেক রহমানের নতুন ধারার রাজনীতি: কথার চেয়ে কাজে প্রমাণের পরীক্ষা



তারেক রহমানের নতুন ধারার রাজনীতি: কথার চেয়ে কাজে প্রমাণের পরীক্ষা
ছবি- সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় পরিচয় ও ক্ষমতার প্রভাবকে কেন্দ্র করে জবাবদিহির প্রশ্নটি উপেক্ষিত থেকেছে। ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা মোকাবিলার বদলে অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। সেই প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিপরীতে নিজের দলের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন এক বার্তা দিয়েছেন। তাঁর এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, দলীয় আনুগত্য কিংবা ব্যক্তির জনপ্রিয়তা নয়, আইন ও জনস্বার্থই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান বিবেচনা।

এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ঘটনা শুধু বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বহুল আলোচিত নীতি,‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ’,এর আলোকে এই সিদ্ধান্তকে দেখা যেতে পারে। রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নিজের দলের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করতে হয়। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সেই বার্তাকেই সামনে এনেছে।

বিএনপির তরুণ নেতা ইশরাক হোসেন দলের রাজনীতিতে একটি পরিচিত ও সম্ভাবনাময় নাম। প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সন্তান হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা এবং রাজপথের সক্রিয় উপস্থিতি দলের নেতা-কর্মীদের কাছে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তাঁর এই অবস্থান নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। তবে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কিংবা দলের প্রতি অবদান কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না,প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তে এই নীতিই গুরুত্ব পেয়েছে।

এর আগে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর দলীয় প্রধানের নির্দেশে ১ অক্টোবর তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর সোমবার ইশরাক হোসেনকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

মিষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর অনেকে হয়তো ভেবেছিলেন, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কোনো নেতার বিরুদ্ধে একই ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া তুলনামূলক কঠিন হবে। ইশরাকের ক্ষেত্রে সেই ধারণা নতুন করে বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কারণ, তিনি কেবল দলের একজন পরিচিত নেতা নন, তাঁর সঙ্গে রয়েছে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা। এমন একজন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, রাজনৈতিক অবস্থান যত শক্তিশালীই হোক, দায়িত্ব পালনে অনিয়ম বা আইনবহির্ভূত আচরণের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

তবে এ ঘটনাকে শুধু একজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব হারানোর ঘটনা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য পুরোপুরি উপলব্ধি করা যাবে না। এখানে মূল প্রশ্নটি হলো,জনপ্রতিনিধি ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কোন সীমার মধ্যে থেকে কাজ করবেন এবং তাঁদের ক্ষমতার ব্যবহার কীভাবে আইনের আওতায় থাকবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই সীমারেখা স্পষ্ট থাকা জরুরি।

মাদক বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা। এর বিস্তার তরুণ প্রজন্মের জীবন, পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা তাই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই বাস্তবতায় ইশরাক হোসেনের মাদকবিরোধী তৎপরতার উদ্দেশ্যকে ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই কোনো পদক্ষেপ আইনসম্মত হয়ে যায় না। অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে পদ্ধতি, এখতিয়ার এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ইশরাক হোসেনের অংশ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সদ্য দায়িত্ব হারানো এই প্রতিমন্ত্রীকে তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের কয়েকজনকে ধরতে নির্দেশ দিতে দেখা যায়। গত শনিবার বিকেলে গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুমটিঘর রেলগেট এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। ভিডিওতে তাঁকে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে কয়েকজনকে ধরতে বলার দৃশ্য দেখা যায়। এ সময় একজনকে গুলি করার হুমকি দেওয়ার শব্দ শোনা যায় এবং তাঁর সঙ্গে থাকা এক দেহরক্ষীকে এক তরুণকে লাথি মারতেও দেখা যায়।

মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অপরিহার্য। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সরকারের নির্বাহী বিভাগের অংশ। তাঁদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা সংবিধান, সরকারের কার্যবিধি এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান দ্বারা নির্ধারিত। সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ ও সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুবাদে কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুলিশের মতো তল্লাশি, আটক কিংবা গ্রেপ্তারের ক্ষমতা অর্জন করেন না। এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য নির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ২১ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মাদকদ্রব্য জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেপ্তারের বিধান রয়েছে। একই আইনের ২৩ ধারায় নির্দিষ্ট শর্তে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং আইন দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য কর্মকর্তাকে। এসব বিধানে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্য হিসেবে স্বতন্ত্রভাবে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার কোনো বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ রাজনৈতিক পদমর্যাদা নিজে থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতা তৈরি করে না।

আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স থাকা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে সেই অস্ত্র প্রদর্শন বা ব্যবহার করার অধিকার থাকা এক বিষয় নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই প্রকাশিত ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০২৫’-এর ২৫ অনুচ্ছেদে অস্ত্র বহন ও ব্যবহারের শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। এর ২৫(ক) উপঅনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, লাইসেন্সধারী ব্যক্তি আত্মরক্ষার জন্য নিজের অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করতে পারবেন। তবে অন্যের মধ্যে ভীতি বা বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।

এই বিধানের তাৎপর্য পরিষ্কার। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে বৈধ অস্ত্র সঙ্গে রাখা এক ধরনের অধিকার; আর সেই অস্ত্র প্রদর্শন করে অন্যকে ভয় দেখানো কিংবা কাউকে আটক করার উদ্যোগ নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অস্ত্রের লাইসেন্স কোনো ব্যক্তিকে পুলিশি অভিযান পরিচালনার আইনগত এখতিয়ার দেয় না। ফলে মাদকবিরোধী তৎপরতার লক্ষ্য সমর্থনযোগ্য হলেও তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি অবশ্যই আইনসম্মত হতে হবে।

ইশরাক হোসেনের ঘটনায় এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। তরুণ বয়সের উদ্দীপনা কিংবা অপরাধ দমনে দৃঢ় অবস্থান থেকে তিনি পদক্ষেপটি নিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় আবেগের পাশাপাশি আইন, দায়িত্ববোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার গুরুত্বও সমান। অপরাধ দমনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। জনপ্রতিনিধিরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারেন, প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে পারেন এবং আইনসম্মত পদক্ষেপের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে পারেন। কিন্তু তাঁরা নিজেরাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিকল্প হয়ে উঠতে পারেন না।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কেউ বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সুযোগ নেওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখতে পারেন, আবার কেউ মাদকবিরোধী উদ্যোগের গুরুত্ব সামনে আনতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার মূল বিবেচনা হওয়া উচিত, কোনো পদক্ষেপ আইনসম্মত ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে আইনগত প্রশ্নকে আড়াল করা হলে তা দীর্ঘ মেয়াদে কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা লক্ষ করা গেছে—নিজ দলের নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা স্বীকার করার বদলে আত্মপক্ষ সমর্থন কিংবা অস্বীকারের পথ বেছে নেওয়া। অনেক সময় দলীয় ভাবমূর্তি রক্ষার যুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগকে গুরুত্বহীন করে দেখানো হয়েছে। অথচ সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের পাশাপাশি তাঁদের কর্মকাণ্ডও পর্যবেক্ষণ করে। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না হলে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জনগণের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়, ক্ষমতাবানদের জন্য আলাদা নিয়ম রয়েছে।

এই ধারণা শুধু একটি দলের ক্ষতি করে না; সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থাকেও দুর্বল করে। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দলীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হলে রাজনৈতিক জবাবদিহি অর্থহীন হয়ে পড়ে। ক্ষমতাসীন দলের জন্যও এর পরিণতি নেতিবাচক। কারণ, সাময়িকভাবে কোনো নেতাকে রক্ষা করা গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে জনসমর্থন ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ কারণে নিজের দলের নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের গুরুত্ব অনেক বেশি। তবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য শোনার সুযোগ এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও জরুরি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা মানে শুধু শাস্তি দেওয়া নয়; বরং সবার জন্য একই আইন, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া এবং সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো এই বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো, দলীয় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির এই অবস্থানকে বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত চর্চায় পরিণত করা। দলের ছোট-বড় সব পর্যায়ের নেতা-কর্মী এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্য একই মানদণ্ড কার্যকর হলে তবেই পরিবর্তনের দাবি বাস্তব ভিত্তি পাবে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত শক্তি শুধু জনপ্রিয়তা কিংবা সাংগঠনিক প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের দলের অনিয়মের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। একই সঙ্গে সেই অবস্থানকে হতে হবে ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও আইনসম্মত। ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যের চেয়ে রাষ্ট্রের আইন এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রয়োজন দীর্ঘদিনের। তারেক রহমানের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সেই পরিবর্তনের সম্ভাবনা সামনে এনেছে। তবে একটি বা দুটি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্থায়ী পরিবর্তন নিশ্চিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। এর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে ভবিষ্যতে—যখন দেখা যাবে, দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না এবং ক্ষমতার ব্যবহার নিয়মতান্ত্রিক থাকছে কি না।

তারেক রহমানের সামনে তাই সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি দায়িত্বও রয়েছে। তিনি যদি নিজের দলের ভেতরে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, তাহলে তাঁর ঘোষিত নতুন ধারার রাজনীতি বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ হবে এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন এবং দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬


তারেক রহমানের নতুন ধারার রাজনীতি: কথার চেয়ে কাজে প্রমাণের পরীক্ষা

প্রকাশের তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় পরিচয় ও ক্ষমতার প্রভাবকে কেন্দ্র করে জবাবদিহির প্রশ্নটি উপেক্ষিত থেকেছে। ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা মোকাবিলার বদলে অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। সেই প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিপরীতে নিজের দলের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন এক বার্তা দিয়েছেন। তাঁর এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, দলীয় আনুগত্য কিংবা ব্যক্তির জনপ্রিয়তা নয়, আইন ও জনস্বার্থই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান বিবেচনা।

এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ঘটনা শুধু বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বহুল আলোচিত নীতি,‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ’,এর আলোকে এই সিদ্ধান্তকে দেখা যেতে পারে। রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নিজের দলের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করতে হয়। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সেই বার্তাকেই সামনে এনেছে।

বিএনপির তরুণ নেতা ইশরাক হোসেন দলের রাজনীতিতে একটি পরিচিত ও সম্ভাবনাময় নাম। প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সন্তান হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা এবং রাজপথের সক্রিয় উপস্থিতি দলের নেতা-কর্মীদের কাছে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তাঁর এই অবস্থান নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। তবে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কিংবা দলের প্রতি অবদান কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না,প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তে এই নীতিই গুরুত্ব পেয়েছে।

এর আগে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর দলীয় প্রধানের নির্দেশে ১ অক্টোবর তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর সোমবার ইশরাক হোসেনকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

মিষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর অনেকে হয়তো ভেবেছিলেন, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কোনো নেতার বিরুদ্ধে একই ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া তুলনামূলক কঠিন হবে। ইশরাকের ক্ষেত্রে সেই ধারণা নতুন করে বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কারণ, তিনি কেবল দলের একজন পরিচিত নেতা নন, তাঁর সঙ্গে রয়েছে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা। এমন একজন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, রাজনৈতিক অবস্থান যত শক্তিশালীই হোক, দায়িত্ব পালনে অনিয়ম বা আইনবহির্ভূত আচরণের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

তবে এ ঘটনাকে শুধু একজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব হারানোর ঘটনা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য পুরোপুরি উপলব্ধি করা যাবে না। এখানে মূল প্রশ্নটি হলো,জনপ্রতিনিধি ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কোন সীমার মধ্যে থেকে কাজ করবেন এবং তাঁদের ক্ষমতার ব্যবহার কীভাবে আইনের আওতায় থাকবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই সীমারেখা স্পষ্ট থাকা জরুরি।

মাদক বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা। এর বিস্তার তরুণ প্রজন্মের জীবন, পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা তাই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই বাস্তবতায় ইশরাক হোসেনের মাদকবিরোধী তৎপরতার উদ্দেশ্যকে ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই কোনো পদক্ষেপ আইনসম্মত হয়ে যায় না। অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে পদ্ধতি, এখতিয়ার এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ইশরাক হোসেনের অংশ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সদ্য দায়িত্ব হারানো এই প্রতিমন্ত্রীকে তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের কয়েকজনকে ধরতে নির্দেশ দিতে দেখা যায়। গত শনিবার বিকেলে গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুমটিঘর রেলগেট এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। ভিডিওতে তাঁকে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে কয়েকজনকে ধরতে বলার দৃশ্য দেখা যায়। এ সময় একজনকে গুলি করার হুমকি দেওয়ার শব্দ শোনা যায় এবং তাঁর সঙ্গে থাকা এক দেহরক্ষীকে এক তরুণকে লাথি মারতেও দেখা যায়।

মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অপরিহার্য। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সরকারের নির্বাহী বিভাগের অংশ। তাঁদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা সংবিধান, সরকারের কার্যবিধি এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান দ্বারা নির্ধারিত। সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ ও সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুবাদে কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুলিশের মতো তল্লাশি, আটক কিংবা গ্রেপ্তারের ক্ষমতা অর্জন করেন না। এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য নির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ২১ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মাদকদ্রব্য জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেপ্তারের বিধান রয়েছে। একই আইনের ২৩ ধারায় নির্দিষ্ট শর্তে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং আইন দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য কর্মকর্তাকে। এসব বিধানে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্য হিসেবে স্বতন্ত্রভাবে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার কোনো বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ রাজনৈতিক পদমর্যাদা নিজে থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতা তৈরি করে না।

আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স থাকা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে সেই অস্ত্র প্রদর্শন বা ব্যবহার করার অধিকার থাকা এক বিষয় নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই প্রকাশিত ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০২৫’-এর ২৫ অনুচ্ছেদে অস্ত্র বহন ও ব্যবহারের শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। এর ২৫(ক) উপঅনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, লাইসেন্সধারী ব্যক্তি আত্মরক্ষার জন্য নিজের অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করতে পারবেন। তবে অন্যের মধ্যে ভীতি বা বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।

এই বিধানের তাৎপর্য পরিষ্কার। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে বৈধ অস্ত্র সঙ্গে রাখা এক ধরনের অধিকার; আর সেই অস্ত্র প্রদর্শন করে অন্যকে ভয় দেখানো কিংবা কাউকে আটক করার উদ্যোগ নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অস্ত্রের লাইসেন্স কোনো ব্যক্তিকে পুলিশি অভিযান পরিচালনার আইনগত এখতিয়ার দেয় না। ফলে মাদকবিরোধী তৎপরতার লক্ষ্য সমর্থনযোগ্য হলেও তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি অবশ্যই আইনসম্মত হতে হবে।

ইশরাক হোসেনের ঘটনায় এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। তরুণ বয়সের উদ্দীপনা কিংবা অপরাধ দমনে দৃঢ় অবস্থান থেকে তিনি পদক্ষেপটি নিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় আবেগের পাশাপাশি আইন, দায়িত্ববোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার গুরুত্বও সমান। অপরাধ দমনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। জনপ্রতিনিধিরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারেন, প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে পারেন এবং আইনসম্মত পদক্ষেপের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে পারেন। কিন্তু তাঁরা নিজেরাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিকল্প হয়ে উঠতে পারেন না।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কেউ বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সুযোগ নেওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখতে পারেন, আবার কেউ মাদকবিরোধী উদ্যোগের গুরুত্ব সামনে আনতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার মূল বিবেচনা হওয়া উচিত, কোনো পদক্ষেপ আইনসম্মত ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে আইনগত প্রশ্নকে আড়াল করা হলে তা দীর্ঘ মেয়াদে কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা লক্ষ করা গেছে—নিজ দলের নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা স্বীকার করার বদলে আত্মপক্ষ সমর্থন কিংবা অস্বীকারের পথ বেছে নেওয়া। অনেক সময় দলীয় ভাবমূর্তি রক্ষার যুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগকে গুরুত্বহীন করে দেখানো হয়েছে। অথচ সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের পাশাপাশি তাঁদের কর্মকাণ্ডও পর্যবেক্ষণ করে। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না হলে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জনগণের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়, ক্ষমতাবানদের জন্য আলাদা নিয়ম রয়েছে।

এই ধারণা শুধু একটি দলের ক্ষতি করে না; সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থাকেও দুর্বল করে। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দলীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হলে রাজনৈতিক জবাবদিহি অর্থহীন হয়ে পড়ে। ক্ষমতাসীন দলের জন্যও এর পরিণতি নেতিবাচক। কারণ, সাময়িকভাবে কোনো নেতাকে রক্ষা করা গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে জনসমর্থন ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ কারণে নিজের দলের নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের গুরুত্ব অনেক বেশি। তবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য শোনার সুযোগ এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও জরুরি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা মানে শুধু শাস্তি দেওয়া নয়; বরং সবার জন্য একই আইন, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া এবং সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো এই বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো, দলীয় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির এই অবস্থানকে বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত চর্চায় পরিণত করা। দলের ছোট-বড় সব পর্যায়ের নেতা-কর্মী এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্য একই মানদণ্ড কার্যকর হলে তবেই পরিবর্তনের দাবি বাস্তব ভিত্তি পাবে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত শক্তি শুধু জনপ্রিয়তা কিংবা সাংগঠনিক প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের দলের অনিয়মের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। একই সঙ্গে সেই অবস্থানকে হতে হবে ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও আইনসম্মত। ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যের চেয়ে রাষ্ট্রের আইন এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রয়োজন দীর্ঘদিনের। তারেক রহমানের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সেই পরিবর্তনের সম্ভাবনা সামনে এনেছে। তবে একটি বা দুটি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্থায়ী পরিবর্তন নিশ্চিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। এর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে ভবিষ্যতে—যখন দেখা যাবে, দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না এবং ক্ষমতার ব্যবহার নিয়মতান্ত্রিক থাকছে কি না।

তারেক রহমানের সামনে তাই সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি দায়িত্বও রয়েছে। তিনি যদি নিজের দলের ভেতরে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, তাহলে তাঁর ঘোষিত নতুন ধারার রাজনীতি বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ হবে এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন এবং দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত