জয়পুরহাট    শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
Daily Joypur Barta

স্টেথোস্কোপের ওপাশে এক মানবিক হৃদয়



স্টেথোস্কোপের ওপাশে এক মানবিক হৃদয়
ছবি- প্রতিনিধি

মাসের নির্দিষ্ট একটি দিন। সকাল থেকেই নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার সারতা সারাশন বাজারে মানুষের ভিড়। কেউ এসেছেন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে, কেউ এসেছেন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশায়। কারও প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা, কেউ আবার এসেছেন মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে। বয়সে কেউ প্রবীণ, কেউ মধ্যবয়সী, আবার কারও কোলে শিশু।


সাধারণ একটি বাজার হলেও সেদিন সেখানে তৈরি হয় ভিন্ন এক পরিবেশ। অসহায় মানুষের মুখে প্রত্যাশা, আর সেবাদানকারীদের ব্যস্ততায় ফুটে ওঠে মানবিকতার এক অন্যরকম চিত্র। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক ও খাদ্য সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। আর এসব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে রয়েছেন একজন চিকিৎসক ডা. এস এম রাহিদুজ্জামান রানা।

পেশাগত জীবনে তিনি ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের কার্ডিওলজি (হৃদরোগ) বিভাগের চিকিৎসক। কিন্তু নিজ এলাকার মানুষের কাছে তার আরেকটি পরিচয় তিনি একজন মানবিক চিকিৎসক, যিনি পেশার বাইরেও মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান। প্রায় দেড় বছর ধরে নিয়মিতভাবে নিজ এলাকা মহাদেবপুরের অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন তিনি।

নিজের দাদা-দাদির স্মৃতিকে ধরে রাখতে তাদের নামে কাশেম আলী সরদার-জয়নুর বিবি বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন ডা. এস এম রাহিদুজ্জামান রানা। সেই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেই শুরু হয় নিয়মিত সেবামূলক কার্যক্রম।

প্রায় ৬০ জনের অধিক সদস্যের একটি টিম নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ফাউন্ডেশনটির কার্যক্রম। শুরু থেকেই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, অসচ্ছল পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা, মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নে সহায়তা এবং বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে সংগঠনটি। ফাউন্ডেশনের মূলমন্ত্রও সেবার দর্শনকে স্পষ্ট করে ‘মানুষের পাশে, মানবতার বিকাশে, সৃষ্টির সেবায়, স্রষ্টার সন্তুষ্টি।’

এই সেবার পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। মাসের নির্দিষ্ট দিনে এলাকায় মাইকিং করে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার কথা জানানো হয়। ফলে দূর-দূরান্ত থেকেও অসহায় মানুষ এসে হাজির হন সেবাকেন্দ্রে।

সম্প্রতি সরেজমিনে সারতা সারাশন বাজারে ফাউন্ডেশনের সেবামূলক কার্যক্রমে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতি। কেউ চিকিৎসকের সামনে বসে নিজের অসুস্থতার কথা বলছেন। কেউ চিকিৎসা নিচ্ছেন। আবার কেউ নিজের পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরছেন।

শুধু চিকিৎসা নয়, মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে সহায়তার ধরনও নির্ধারণ করা হচ্ছে। কোনো পরিবার আর্থিক সংকটে থাকলে দেওয়া হচ্ছে অর্থ সহায়তা। কারও প্রয়োজন হলে খাদ্য সহায়তাও করা হচ্ছে। পাশাপাশি মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা ও সহযোগিতা করা হচ্ছে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে সেখানে যেন তৈরি হয়েছে মানুষের প্রয়োজনের কথা বলার একটি জায়গা।

সারতা গ্রামের ইতি আরা বেগমের কথাই ধরা যাক। সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। স্বামী-সন্তান দিনমজুর। মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে। কিন্তু মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই পরিবারের। এই দুশ্চিন্তা নিয়েই তিনি এসেছিলেন ডা. রাহিদুজ্জামানের কাছে। চিকিৎসা নিতে নয়, এসেছিলেন আর্থিক সহায়তার প্রত্যাশায়।

ইতি আরা বেগম বলেন, আমরা খুবই অসহায় একটা পরিবার। আমার মেয়েকে বিয়ে দিতে চাই। স্বামী-সন্তান দিনমজুর। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। তাই ডা. রাহিদুজ্জামানের কাছে এসেছি। তিনি আমাদের যথেষ্ট আর্থিকভাবে সাহায্য করেছেন। তাঁর এমন মহৎ কাজের জন্য দোয়া করি। ইতি আরা বেগমের মতো অনেক পরিবারের কাছেই এই সহায়তা হয়তো বড় কোনো অঙ্ক নয়, কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে সেটিই হয়ে ওঠে বড় ভরসা।

স্থানীয় সারতা পশ্চিম পাড়ার অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসা শিক্ষক ওয়াজেদ আলীও ডা. রাহিদুজ্জামানের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, কাশেম আলী সরদার-জয়নুর বিবি বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ডা. এস এম রাহিদুজ্জামান রানা একজন মানবিক মানুষ। প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট দিন ঠিক করে এলাকায় মাইকিং করে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য অবগত করা হয়। তিনি খুবই যত্ন সহকারে সেবা দিয়ে থাকেন। পাশাপাশি আর্থিক সহায়তাও করা হয়।

ফাউন্ডেশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেড় বছরের এই পথচলায় প্রান্তিক পর্যায়ের ১ হাজার ৫৭ জন মানুষ চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন। চলতি মাসেও মহাদেবপুরে দিনব্যাপী আয়োজন করা হয় বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার। এতে বিভিন্ন বয়সী শতাধিক অসহায় ও দরিদ্র মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পান। একইসঙ্গে ১০টি অসচ্ছল পরিবারকে দেওয়া হয় আর্থিক সহায়তা। এর বাইরে বিভিন্ন সময়ে অসচ্ছল পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা, প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা, মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নে সহায়তা এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও রয়েছে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম। মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয়েছে সংবর্ধনা।

একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য শুধু তার নিজের নয়, পরিবার ও সমাজেরও সাফল্য এই ধারণা থেকেই মেধার স্বীকৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

সংবর্ধনা পাওয়া নন্দিতা সাহা ও জুবায়ের হোসেন বলেন, মেধার স্বীকৃতি হিসেবে সংবর্ধনা পাওয়ায় খুবই ভালো লাগছে। ডা. এস এম রাহিদুজ্জামান রানা স্যার একজন অসাধারণ মানুষ। তাঁর প্রতিটি উদ্যোগ আমাদের আগামীতে আরও অনুপ্রাণিত করবে। শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়ার এই উদ্যোগ তাদের শুধু আনন্দই দেয়নি, বরং ভবিষ্যতে আরও ভালো করার জন্য উৎসাহও জুগিয়েছে।

নিজের সেবামূলক কার্যক্রমের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ডা. এস এম রাহিদুজ্জামান রানা বলেন, এ মাসে আমরা মহাদেবপুরে দিনব্যাপী বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার আয়োজন করেছি এবং ১০টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করেছি। এলাকার বিভিন্ন বয়সী শতাধিক অসহায় ও দরিদ্র মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন। এ ছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের এই সেবামূলক কার্যক্রমের পথচলা দেড় বছরে আমরা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছি ১ হাজার ৫৭ জনকে। বহু অসচ্ছল পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করেছি। মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নে শরিক হয়েছি। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কিছু সহায়তাও করেছি।

মানুষের জন্য আরও বড় পরিসরে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমি চাই এলাকার মানুষ শুধু নয়, আরও বড় পরিসরে এসব সেবামূলক কার্যক্রম সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই। আমি ও আমার স্ত্রী দুজনই চিকিৎসক। আল্লাহর রহমতে পারিবারিকভাবে স্বচ্ছল আমরা। মানুষের সেবা করে বাকি জীবনটা পার করতে চাই।

শুধু বর্তমান কার্যক্রম নয়, ভবিষ্যৎ নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে তার। ডা. রাহিদুজ্জামান জানান, আগামীতে একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তার।
মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মানজুরা মুশাররফ বলেন, কাশেম আলী সরদার-জয়নুর বিবি বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ডা. এস এম রাহিদুজ্জামান রানা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অসহায় পরিবারদের মাঝে সহায়তাসহ নানা সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছেন। তার এমন উদ্যোগ অনেকের জন্য অনুকরণীয় হবে বলে আশা করছি। যদি কখনো উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হয়, তবে অবশ্যই আমরা তা করব।

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬


স্টেথোস্কোপের ওপাশে এক মানবিক হৃদয়

প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

মাসের নির্দিষ্ট একটি দিন। সকাল থেকেই নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার সারতা সারাশন বাজারে মানুষের ভিড়। কেউ এসেছেন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে, কেউ এসেছেন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশায়। কারও প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা, কেউ আবার এসেছেন মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে। বয়সে কেউ প্রবীণ, কেউ মধ্যবয়সী, আবার কারও কোলে শিশু।


সাধারণ একটি বাজার হলেও সেদিন সেখানে তৈরি হয় ভিন্ন এক পরিবেশ। অসহায় মানুষের মুখে প্রত্যাশা, আর সেবাদানকারীদের ব্যস্ততায় ফুটে ওঠে মানবিকতার এক অন্যরকম চিত্র। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক ও খাদ্য সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। আর এসব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে রয়েছেন একজন চিকিৎসক ডা. এস এম রাহিদুজ্জামান রানা।

পেশাগত জীবনে তিনি ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের কার্ডিওলজি (হৃদরোগ) বিভাগের চিকিৎসক। কিন্তু নিজ এলাকার মানুষের কাছে তার আরেকটি পরিচয় তিনি একজন মানবিক চিকিৎসক, যিনি পেশার বাইরেও মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান। প্রায় দেড় বছর ধরে নিয়মিতভাবে নিজ এলাকা মহাদেবপুরের অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন তিনি।

নিজের দাদা-দাদির স্মৃতিকে ধরে রাখতে তাদের নামে কাশেম আলী সরদার-জয়নুর বিবি বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন ডা. এস এম রাহিদুজ্জামান রানা। সেই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেই শুরু হয় নিয়মিত সেবামূলক কার্যক্রম।

প্রায় ৬০ জনের অধিক সদস্যের একটি টিম নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ফাউন্ডেশনটির কার্যক্রম। শুরু থেকেই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, অসচ্ছল পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা, মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নে সহায়তা এবং বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে সংগঠনটি। ফাউন্ডেশনের মূলমন্ত্রও সেবার দর্শনকে স্পষ্ট করে ‘মানুষের পাশে, মানবতার বিকাশে, সৃষ্টির সেবায়, স্রষ্টার সন্তুষ্টি।’

এই সেবার পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। মাসের নির্দিষ্ট দিনে এলাকায় মাইকিং করে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার কথা জানানো হয়। ফলে দূর-দূরান্ত থেকেও অসহায় মানুষ এসে হাজির হন সেবাকেন্দ্রে।

সম্প্রতি সরেজমিনে সারতা সারাশন বাজারে ফাউন্ডেশনের সেবামূলক কার্যক্রমে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতি। কেউ চিকিৎসকের সামনে বসে নিজের অসুস্থতার কথা বলছেন। কেউ চিকিৎসা নিচ্ছেন। আবার কেউ নিজের পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরছেন।

শুধু চিকিৎসা নয়, মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে সহায়তার ধরনও নির্ধারণ করা হচ্ছে। কোনো পরিবার আর্থিক সংকটে থাকলে দেওয়া হচ্ছে অর্থ সহায়তা। কারও প্রয়োজন হলে খাদ্য সহায়তাও করা হচ্ছে। পাশাপাশি মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা ও সহযোগিতা করা হচ্ছে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে সেখানে যেন তৈরি হয়েছে মানুষের প্রয়োজনের কথা বলার একটি জায়গা।

সারতা গ্রামের ইতি আরা বেগমের কথাই ধরা যাক। সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। স্বামী-সন্তান দিনমজুর। মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে। কিন্তু মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই পরিবারের। এই দুশ্চিন্তা নিয়েই তিনি এসেছিলেন ডা. রাহিদুজ্জামানের কাছে। চিকিৎসা নিতে নয়, এসেছিলেন আর্থিক সহায়তার প্রত্যাশায়।

ইতি আরা বেগম বলেন, আমরা খুবই অসহায় একটা পরিবার। আমার মেয়েকে বিয়ে দিতে চাই। স্বামী-সন্তান দিনমজুর। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। তাই ডা. রাহিদুজ্জামানের কাছে এসেছি। তিনি আমাদের যথেষ্ট আর্থিকভাবে সাহায্য করেছেন। তাঁর এমন মহৎ কাজের জন্য দোয়া করি। ইতি আরা বেগমের মতো অনেক পরিবারের কাছেই এই সহায়তা হয়তো বড় কোনো অঙ্ক নয়, কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে সেটিই হয়ে ওঠে বড় ভরসা।

স্থানীয় সারতা পশ্চিম পাড়ার অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসা শিক্ষক ওয়াজেদ আলীও ডা. রাহিদুজ্জামানের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, কাশেম আলী সরদার-জয়নুর বিবি বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ডা. এস এম রাহিদুজ্জামান রানা একজন মানবিক মানুষ। প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট দিন ঠিক করে এলাকায় মাইকিং করে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য অবগত করা হয়। তিনি খুবই যত্ন সহকারে সেবা দিয়ে থাকেন। পাশাপাশি আর্থিক সহায়তাও করা হয়।

ফাউন্ডেশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেড় বছরের এই পথচলায় প্রান্তিক পর্যায়ের ১ হাজার ৫৭ জন মানুষ চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন। চলতি মাসেও মহাদেবপুরে দিনব্যাপী আয়োজন করা হয় বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার। এতে বিভিন্ন বয়সী শতাধিক অসহায় ও দরিদ্র মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পান। একইসঙ্গে ১০টি অসচ্ছল পরিবারকে দেওয়া হয় আর্থিক সহায়তা। এর বাইরে বিভিন্ন সময়ে অসচ্ছল পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা, প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা, মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নে সহায়তা এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও রয়েছে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম। মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয়েছে সংবর্ধনা।

একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য শুধু তার নিজের নয়, পরিবার ও সমাজেরও সাফল্য এই ধারণা থেকেই মেধার স্বীকৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

সংবর্ধনা পাওয়া নন্দিতা সাহা ও জুবায়ের হোসেন বলেন, মেধার স্বীকৃতি হিসেবে সংবর্ধনা পাওয়ায় খুবই ভালো লাগছে। ডা. এস এম রাহিদুজ্জামান রানা স্যার একজন অসাধারণ মানুষ। তাঁর প্রতিটি উদ্যোগ আমাদের আগামীতে আরও অনুপ্রাণিত করবে। শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়ার এই উদ্যোগ তাদের শুধু আনন্দই দেয়নি, বরং ভবিষ্যতে আরও ভালো করার জন্য উৎসাহও জুগিয়েছে।

নিজের সেবামূলক কার্যক্রমের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ডা. এস এম রাহিদুজ্জামান রানা বলেন, এ মাসে আমরা মহাদেবপুরে দিনব্যাপী বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার আয়োজন করেছি এবং ১০টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করেছি। এলাকার বিভিন্ন বয়সী শতাধিক অসহায় ও দরিদ্র মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন। এ ছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের এই সেবামূলক কার্যক্রমের পথচলা দেড় বছরে আমরা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছি ১ হাজার ৫৭ জনকে। বহু অসচ্ছল পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করেছি। মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নে শরিক হয়েছি। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কিছু সহায়তাও করেছি।

মানুষের জন্য আরও বড় পরিসরে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমি চাই এলাকার মানুষ শুধু নয়, আরও বড় পরিসরে এসব সেবামূলক কার্যক্রম সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই। আমি ও আমার স্ত্রী দুজনই চিকিৎসক। আল্লাহর রহমতে পারিবারিকভাবে স্বচ্ছল আমরা। মানুষের সেবা করে বাকি জীবনটা পার করতে চাই।

শুধু বর্তমান কার্যক্রম নয়, ভবিষ্যৎ নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে তার। ডা. রাহিদুজ্জামান জানান, আগামীতে একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তার।
মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মানজুরা মুশাররফ বলেন, কাশেম আলী সরদার-জয়নুর বিবি বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ডা. এস এম রাহিদুজ্জামান রানা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অসহায় পরিবারদের মাঝে সহায়তাসহ নানা সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছেন। তার এমন উদ্যোগ অনেকের জন্য অনুকরণীয় হবে বলে আশা করছি। যদি কখনো উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হয়, তবে অবশ্যই আমরা তা করব।


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত