একসময় যে জলাশয় ও নিচু জমি পড়ে থাকত অনাবাদী, এখন সেখানেই দুলছে সবুজ পানিফলের লতা। পানির বুকজুড়ে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে ফল। পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক, আর ফলন দেখে মুখে ফুটছে স্বস্তির হাসি। কম খরচে ভালো ফলন ও বাজারে চাহিদা থাকায় নওগাঁর মান্দায় দিন দিন পানিফল চাষের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকরা।
চলতি মৌসুমে মান্দা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিফল চাষে কৃষকদের আগ্রহ আগের তুলনায় বেড়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনে যেখানে সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের পেছনে তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়, সেখানে পানিফল চাষে খরচ কম। পাশাপাশি রোগবালাইয়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম হওয়ায় এ ফসল থেকে ভালো লাভের আশা করছেন তারা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মান্দা উপজেলায় প্রায় ৩ হেক্টর জমিতে পানিফল চাষ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ৬ মেট্রিক টন পানিফল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক বিঘা জমিতে পানিফল চাষে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। উৎপাদন ও বাজারদর ভালো থাকলে খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ২০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব। এ কারণে অনেক কৃষক ধান বা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি পানিফল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
মান্দা উপজেলার ৭ নম্বর প্রসাদপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর এলাকার পানিফল চাষি মোঃ হাফিজুর রহমান (হাবু) বলেন, “পানিফল চাষে খরচ তুলনামূলক কম। রোগবালাইও কম হয়। এবার জমিতে ফলন ভালো হয়েছে এবং বাজারেও চাহিদা রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে পানিফল বিক্রি করে ২ থেকে ২.৫ লক্ষ টাকা লাভ হবে। আগামী বছর আরও বেশি জমিতে পানিফল চাষ করার ইচ্ছা রয়েছে।”
আরেক কৃষক মোঃ আফজাল হোসেন বলেন, “ধান চাষে সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়। পানিফল চাষে খরচ তুলনামূলক কম। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ায় চাষ করতেও সুবিধা হচ্ছে।”
কৃষকদের মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। পানিফলের জমিতে রোগবালাই দেখা দিলে তা শনাক্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকরাও সময়মতো পরিচর্যা করতে পারছেন।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শ্রী বিকাশ চন্দ্র বলেন, “আমরা নিয়মিত পানিফল চাষিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। জমিতে গিয়ে ফসলের অবস্থা দেখছি। কোনো রোগবালাই বা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দিলে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সঠিক সময়ে পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে পানিফলের ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।”
মান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছাঃ শায়লা শারমিন বলেন, “ইউনিয়ন পর্যায়ে আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা পানিফল চাষিদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কখন কী প্রয়োজন, কোন রোগের জন্য কী করণীয়—এসব বিষয়ে নিয়মিত তদারকি ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আমিও নিয়মিত মাঠপর্যায়ে গিয়ে পানিফল চাষের জমি পরিদর্শন করছি।”
তিনি আরও বলেন, “পানিফল চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”
কৃষকদের প্রত্যাশা, পানিফলের বাজার ব্যবস্থা আরও উন্নত করা গেলে এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে আগামীতে এ ফসলের আবাদ আরও বাড়বে। এতে একদিকে যেমন পতিত ও নিচু জমির ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে কম বিনিয়োগে কৃষকদের বাড়তে পারে আয়।
সবুজ পানির বুকজুড়ে পানিফলের আবাদ—আর সেই সবুজের মাঝেই যেন নতুন সম্ভাবনার গল্প লিখছেন মান্দার কৃষকরা। কম খরচে ভালো ফলন ও বাজারে চাহিদা ধরে রাখা গেলে পানিফল চাষ আগামী দিনে স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬
একসময় যে জলাশয় ও নিচু জমি পড়ে থাকত অনাবাদী, এখন সেখানেই দুলছে সবুজ পানিফলের লতা। পানির বুকজুড়ে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে ফল। পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক, আর ফলন দেখে মুখে ফুটছে স্বস্তির হাসি। কম খরচে ভালো ফলন ও বাজারে চাহিদা থাকায় নওগাঁর মান্দায় দিন দিন পানিফল চাষের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকরা।
চলতি মৌসুমে মান্দা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিফল চাষে কৃষকদের আগ্রহ আগের তুলনায় বেড়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনে যেখানে সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের পেছনে তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়, সেখানে পানিফল চাষে খরচ কম। পাশাপাশি রোগবালাইয়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম হওয়ায় এ ফসল থেকে ভালো লাভের আশা করছেন তারা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মান্দা উপজেলায় প্রায় ৩ হেক্টর জমিতে পানিফল চাষ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ৬ মেট্রিক টন পানিফল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক বিঘা জমিতে পানিফল চাষে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। উৎপাদন ও বাজারদর ভালো থাকলে খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ২০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব। এ কারণে অনেক কৃষক ধান বা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি পানিফল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
মান্দা উপজেলার ৭ নম্বর প্রসাদপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর এলাকার পানিফল চাষি মোঃ হাফিজুর রহমান (হাবু) বলেন, “পানিফল চাষে খরচ তুলনামূলক কম। রোগবালাইও কম হয়। এবার জমিতে ফলন ভালো হয়েছে এবং বাজারেও চাহিদা রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে পানিফল বিক্রি করে ২ থেকে ২.৫ লক্ষ টাকা লাভ হবে। আগামী বছর আরও বেশি জমিতে পানিফল চাষ করার ইচ্ছা রয়েছে।”
আরেক কৃষক মোঃ আফজাল হোসেন বলেন, “ধান চাষে সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়। পানিফল চাষে খরচ তুলনামূলক কম। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ায় চাষ করতেও সুবিধা হচ্ছে।”
কৃষকদের মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। পানিফলের জমিতে রোগবালাই দেখা দিলে তা শনাক্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকরাও সময়মতো পরিচর্যা করতে পারছেন।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শ্রী বিকাশ চন্দ্র বলেন, “আমরা নিয়মিত পানিফল চাষিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। জমিতে গিয়ে ফসলের অবস্থা দেখছি। কোনো রোগবালাই বা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দিলে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সঠিক সময়ে পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে পানিফলের ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।”
মান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছাঃ শায়লা শারমিন বলেন, “ইউনিয়ন পর্যায়ে আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা পানিফল চাষিদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কখন কী প্রয়োজন, কোন রোগের জন্য কী করণীয়—এসব বিষয়ে নিয়মিত তদারকি ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আমিও নিয়মিত মাঠপর্যায়ে গিয়ে পানিফল চাষের জমি পরিদর্শন করছি।”
তিনি আরও বলেন, “পানিফল চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”
কৃষকদের প্রত্যাশা, পানিফলের বাজার ব্যবস্থা আরও উন্নত করা গেলে এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে আগামীতে এ ফসলের আবাদ আরও বাড়বে। এতে একদিকে যেমন পতিত ও নিচু জমির ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে কম বিনিয়োগে কৃষকদের বাড়তে পারে আয়।
সবুজ পানির বুকজুড়ে পানিফলের আবাদ—আর সেই সবুজের মাঝেই যেন নতুন সম্ভাবনার গল্প লিখছেন মান্দার কৃষকরা। কম খরচে ভালো ফলন ও বাজারে চাহিদা ধরে রাখা গেলে পানিফল চাষ আগামী দিনে স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন