জয়পুরহাট    বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Daily Joypur Barta

সাইবার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তারেক রহমান সরকারের কঠোর অবস্থান



সাইবার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তারেক রহমান সরকারের কঠোর অবস্থান
ছবি : সংগৃহীত

ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি সাইবার অপরাধও দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গুজব, অপতথ্য, মানহানি, চরিত্রহনন, ব্ল্যাকমেইল, সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ এখন ব্যক্তি থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

এমন বাস্তবতায় সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করার এই উদ্যোগ সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট সংশোধনের লক্ষ্যে প্রস্তুত করা খসড়া বিল এর আগে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়েছিল। মন্ত্রিসভা থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়, সাইবার স্পেসে কর্মরত আইটি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা ও পরামর্শ করতে হবে। 

সে অনুযায়ী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত গ্রহণের জন্য খসড়া বিলটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষার্থী এবং সাইবার স্পেসের ব্যবহারকারীরা তাঁদের মতামত দিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এসব মতামত সংকলনও করা হয়েছে।

আইন প্রণয়নের আগে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত গ্রহণের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সরকারের জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারের একটি দৃষ্টান্ত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যে আইনটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে চাপিয়ে দিতে চায় না, বরং সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত আইন করতে চায়—মতামত গ্রহণের এই প্রক্রিয়ায় তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, সাইবার সুরক্ষা আইনকে কোনোভাবেই নিপীড়নমূলক হতে দেওয়া হবে না। অর্থাৎ সরকার একদিকে সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে চায়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছে।

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মন্ত্রণালয় কিংবা অন্য কোনো সংস্থা বা বাহিনীর কাছে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে যদি বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে সাইবার স্পেস বা ডিজিটাল কিংবা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করছে কিংবা ক্ষুণ্ন করার আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

একইভাবে কোনো তথ্য ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক ঘৃণা কিংবা জাতিগত সহিংসতা সৃষ্টি করে বা করার আশঙ্কা তৈরি করে, বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ বা নির্দেশনা দেয় অথবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মানহানিকর কিংবা রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর হয়, সেসব তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

খসড়ায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এতে সরকারের পাঁচজন মন্ত্রী ছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা থাকবেন। পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ের দুজন বিশেষজ্ঞ রাখার প্রস্তাব রয়েছে, যাঁরা সরকার মনোনীত হবেন।

সাইবার অপরাধের পরিবর্তিত ধরনও প্রস্তাবিত আইনে গুরুত্ব পেয়েছে। যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশ, মানহানি ও হেয় প্রতিপন্ন করার মতো অপরাধের জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। 

সম্পাদিত কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি কোনো তথ্য ব্যবহার করে কাউকে হেয় বা মানহানি করা হলেও তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

এ ছাড়া যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, ডিজিটাল শিশু নিপীড়ন, সেক্সটর্শন, মানহানি, হেয় প্রতিপন্ন করা কিংবা বুলিংয়ের ক্ষেত্রে তথ্য, অডিও, ভিডিও, গ্রাফিকস ও স্থিরচিত্রসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল কনটেন্টকে শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।

নতুন ধারা যুক্ত করে আইনটি আরও কার্যকর ও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুজব, অপতথ্য, হেয় প্রতিপন্ন এবং মানহানিকর তথ্য—এসব বিষয়কে অপরাধের সংজ্ঞার আওতায় এনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তির বিধান করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সংশোধিত আইনে নতুন ২৬/ক ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সাইবার পরিসরে গুজব বা অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের জন্য অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়ায় গুজবের সংজ্ঞাও নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, গুজব বলতে এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবিকে বোঝাবে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে অথবা এমন অস্থিরতা তৈরির ঝুঁকি তৈরি করে।

সংশোধিত আইনের ২৫ নম্বর ধারায় মানহানি ও হেয় প্রতিপন্ন সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রেও নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। 

কোনো ব্যক্তির মানহানি বা হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে তথ্য, অডিও, ভিডিও, অডিও-ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থিরচিত্র, গ্রাফিকস কিংবা এআই দিয়ে নির্মিত কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ অপরাধে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানহানি বা হেয় প্রতিপন্ন করে কোনো কনটেন্ট প্রচার করলে শাস্তির মাত্রা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। 

এ ক্ষেত্রে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মানহানির ব্যাখ্যায় দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এই বিধানগুলো যুক্ত হলে সাইবার অপরাধের শিকার সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষায় তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সাইবার অপরাধকে শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে না দেখে নাগরিকের নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এখন শুধু কোনো ব্যক্তির জন্য ক্ষতির কারণ নয়; এর প্রভাব পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর পড়ছে।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হওয়ার পরিবর্তে এসব প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে অন্যকে নোংরা, কুরুচিপূর্ণ ও অপমানজনক ভাষায় আক্রমণ করার প্রবণতা বাড়ছে। 

এক শ্রেণির মানুষ বিভিন্ন ব্যক্তির চরিত্রহনন, ব্ল্যাকমেইল এবং চাঁদাবাজিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অংশ এখন নৈরাজ্য ও অস্থিরতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর ব্যবহার প্রতিরোধে নানা ধরনের আইন ও বিধিবিধান করেছে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সাইবার অপরাধের ধরন ও পরিধি বিবেচনায় কার্যকর আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ১০ এপ্রিল সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ পাস হলেও বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনটিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সাইবার বুলিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য, চরিত্রহনন, অনলাইন হয়রানি ও সাইবার চাঁদাবাজির মতো অপরাধ প্রতিরোধে আরও সুস্পষ্ট আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

বাস্তবতা হলো, সংঘবদ্ধ একটি চক্র বিদেশে বসেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও উদ্যোক্তাদের টার্গেট করছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। 

তাঁদের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হচ্ছে। অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হচ্ছে ধারাবাহিক অনলাইন আক্রমণ। অসত্য ও ভিত্তিহীন বিভিন্ন কনটেন্ট ছড়িয়ে তাঁদের সামাজিক ও ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একপর্যায়ে অর্থ আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

অনেক ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা সামাজিক মর্যাদা এবং ব্যবসায়িক সুনাম রক্ষার জন্য এসব সাইবার চাঁদাবাজের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

আর যাঁরা এসব কর্মকাণ্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করছেন না, তাঁদেরও নানা ধরনের সামাজিক ও ব্যক্তিগত চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

সাইবার বুলিংয়ের কারণে অনেক মানুষ সামাজিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের অনলাইন হয়রানি, অপমান, হুমকি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ঘটনা তাঁদের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। 

অনেক ক্ষেত্রে এসব হয়রানির পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। ফলে সাইবার বুলিংকে নিছক অনলাইন কৌতুক বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

আগে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সন্ত্রাসী বা মাস্তান ব্যবহার করার ঘটনা দেখা যেত। এখন প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সেই প্রবণতার নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কাউকে হেয় করা, ভয় দেখানো, চরিত্রহনন করা কিংবা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নারীদের ক্ষেত্রেও অনলাইন হয়রানি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুধু নারী কিংবা ব্যক্তিগত পর্যায়ের মানুষই নয়, সাইবার অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রদায়ও। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, মাজার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ নানা স্পর্শকাতর বিষয়কে কেন্দ্র করে ভুল তথ্য ছড়ানোর ঘটনাও দেখা যায়। 

এমনকি মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও অপতথ্য প্রচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড মানুষের মধ্যে ভয়, ক্ষোভ, বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস বাড়াতে পারেন।

তবে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটসের ১৯ নম্বর ধারায় প্রত্যেক মানুষের মতামত রাখা এবং তা প্রকাশের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কী ভাববে এবং কী বলবে—সে বিষয়ে তার মৌলিক অধিকার রয়েছে।

একই সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসের ১৯(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে। অন্যের সুনাম, অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষা কিংবা সমাজের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে আইনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যেতে পারে। 

অর্থাৎ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করে অন্যের অধিকার ও নিরাপত্তা ধ্বংস করার সুযোগও থাকা উচিত নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নাৎসি বাহিনী পরিকল্পিত প্রচারণার মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বিশ্বকে দেখিয়েছে, মিথ্যা প্রচারণা ও ঘৃণার বিস্তার কতটা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির কারণে সেই প্রচারণা আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আগে কোনো অপপ্রচার লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগত। এখন একটি পোস্ট, ভিডিও কিংবা গ্রাফিকস কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব বা অপতথ্যের ক্ষতি অনেক বেশি দ্রুত ও ব্যাপক হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ক্ষতিকর ডিজিটাল কনটেন্ট মোকাবিলায় বিভিন্ন ধরনের আইন ও নীতিমালা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন প্রয়োজন।

এই জায়গায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের উদ্যোগটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ সরকার যদি একদিকে সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয় এবং অন্যদিকে আইনটির অপব্যবহার রোধে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করে, তাহলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

আইনটি চূড়ান্ত করার আগে বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের মতামত গ্রহণের উদ্যোগ সরকারের আন্তরিকতার বিষয়টি স্পষ্ট করে। জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে আইন প্রণয়নের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হলে আইনটির গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।

সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়াও প্রয়োজন। কারণ একটি ভালো সাইবার আইন শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়; একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নারী, শিশু এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যও প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যে সাইবার অপরাধকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং আইন সংশোধনের আগে বিভিন্ন মহলের মতামত নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, তা সরকারের সদিচ্ছা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করে। এখন প্রয়োজন সেই উদ্যোগকে বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকর করা।

সাইবারজগতে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনও পূর্ণাঙ্গভাবে সুরক্ষিত রাখা কঠিন। তাই সাইবার সন্ত্রাস, গুজব, অপতথ্য, বুলিং, মানহানি ও অনলাইন চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইন প্রণয়নই হওয়া উচিত সরকারের লক্ষ্য।

এই বাস্তবতায় সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ শুধু একটি আইন পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি নাগরিকের ডিজিটাল নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সরকারের সদিচ্ছা, অংশীজনের মতামত এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে একটি কার্যকর আইন প্রণয়ন সম্ভব হলে সাইবার অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্যও একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সাইবার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তারেক রহমান সরকারের কঠোর অবস্থান

প্রকাশের তারিখ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি সাইবার অপরাধও দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গুজব, অপতথ্য, মানহানি, চরিত্রহনন, ব্ল্যাকমেইল, সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ এখন ব্যক্তি থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

এমন বাস্তবতায় সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করার এই উদ্যোগ সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট সংশোধনের লক্ষ্যে প্রস্তুত করা খসড়া বিল এর আগে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়েছিল। মন্ত্রিসভা থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়, সাইবার স্পেসে কর্মরত আইটি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা ও পরামর্শ করতে হবে। 

সে অনুযায়ী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত গ্রহণের জন্য খসড়া বিলটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষার্থী এবং সাইবার স্পেসের ব্যবহারকারীরা তাঁদের মতামত দিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এসব মতামত সংকলনও করা হয়েছে।

আইন প্রণয়নের আগে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত গ্রহণের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সরকারের জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারের একটি দৃষ্টান্ত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যে আইনটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে চাপিয়ে দিতে চায় না, বরং সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত আইন করতে চায়—মতামত গ্রহণের এই প্রক্রিয়ায় তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, সাইবার সুরক্ষা আইনকে কোনোভাবেই নিপীড়নমূলক হতে দেওয়া হবে না। অর্থাৎ সরকার একদিকে সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে চায়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছে।

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মন্ত্রণালয় কিংবা অন্য কোনো সংস্থা বা বাহিনীর কাছে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে যদি বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে সাইবার স্পেস বা ডিজিটাল কিংবা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করছে কিংবা ক্ষুণ্ন করার আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

একইভাবে কোনো তথ্য ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক ঘৃণা কিংবা জাতিগত সহিংসতা সৃষ্টি করে বা করার আশঙ্কা তৈরি করে, বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ বা নির্দেশনা দেয় অথবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মানহানিকর কিংবা রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর হয়, সেসব তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

খসড়ায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এতে সরকারের পাঁচজন মন্ত্রী ছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা থাকবেন। পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ের দুজন বিশেষজ্ঞ রাখার প্রস্তাব রয়েছে, যাঁরা সরকার মনোনীত হবেন।

সাইবার অপরাধের পরিবর্তিত ধরনও প্রস্তাবিত আইনে গুরুত্ব পেয়েছে। যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশ, মানহানি ও হেয় প্রতিপন্ন করার মতো অপরাধের জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। 

সম্পাদিত কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি কোনো তথ্য ব্যবহার করে কাউকে হেয় বা মানহানি করা হলেও তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

এ ছাড়া যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, ডিজিটাল শিশু নিপীড়ন, সেক্সটর্শন, মানহানি, হেয় প্রতিপন্ন করা কিংবা বুলিংয়ের ক্ষেত্রে তথ্য, অডিও, ভিডিও, গ্রাফিকস ও স্থিরচিত্রসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল কনটেন্টকে শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।

নতুন ধারা যুক্ত করে আইনটি আরও কার্যকর ও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুজব, অপতথ্য, হেয় প্রতিপন্ন এবং মানহানিকর তথ্য—এসব বিষয়কে অপরাধের সংজ্ঞার আওতায় এনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তির বিধান করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সংশোধিত আইনে নতুন ২৬/ক ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সাইবার পরিসরে গুজব বা অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের জন্য অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়ায় গুজবের সংজ্ঞাও নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, গুজব বলতে এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবিকে বোঝাবে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে অথবা এমন অস্থিরতা তৈরির ঝুঁকি তৈরি করে।

সংশোধিত আইনের ২৫ নম্বর ধারায় মানহানি ও হেয় প্রতিপন্ন সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রেও নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। 

কোনো ব্যক্তির মানহানি বা হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে তথ্য, অডিও, ভিডিও, অডিও-ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থিরচিত্র, গ্রাফিকস কিংবা এআই দিয়ে নির্মিত কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ অপরাধে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানহানি বা হেয় প্রতিপন্ন করে কোনো কনটেন্ট প্রচার করলে শাস্তির মাত্রা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। 

এ ক্ষেত্রে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মানহানির ব্যাখ্যায় দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এই বিধানগুলো যুক্ত হলে সাইবার অপরাধের শিকার সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষায় তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সাইবার অপরাধকে শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে না দেখে নাগরিকের নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এখন শুধু কোনো ব্যক্তির জন্য ক্ষতির কারণ নয়; এর প্রভাব পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর পড়ছে।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হওয়ার পরিবর্তে এসব প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে অন্যকে নোংরা, কুরুচিপূর্ণ ও অপমানজনক ভাষায় আক্রমণ করার প্রবণতা বাড়ছে। 

এক শ্রেণির মানুষ বিভিন্ন ব্যক্তির চরিত্রহনন, ব্ল্যাকমেইল এবং চাঁদাবাজিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অংশ এখন নৈরাজ্য ও অস্থিরতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর ব্যবহার প্রতিরোধে নানা ধরনের আইন ও বিধিবিধান করেছে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সাইবার অপরাধের ধরন ও পরিধি বিবেচনায় কার্যকর আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ১০ এপ্রিল সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ পাস হলেও বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনটিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সাইবার বুলিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য, চরিত্রহনন, অনলাইন হয়রানি ও সাইবার চাঁদাবাজির মতো অপরাধ প্রতিরোধে আরও সুস্পষ্ট আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

বাস্তবতা হলো, সংঘবদ্ধ একটি চক্র বিদেশে বসেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও উদ্যোক্তাদের টার্গেট করছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। 

তাঁদের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হচ্ছে। অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হচ্ছে ধারাবাহিক অনলাইন আক্রমণ। অসত্য ও ভিত্তিহীন বিভিন্ন কনটেন্ট ছড়িয়ে তাঁদের সামাজিক ও ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একপর্যায়ে অর্থ আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

অনেক ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা সামাজিক মর্যাদা এবং ব্যবসায়িক সুনাম রক্ষার জন্য এসব সাইবার চাঁদাবাজের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

আর যাঁরা এসব কর্মকাণ্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করছেন না, তাঁদেরও নানা ধরনের সামাজিক ও ব্যক্তিগত চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

সাইবার বুলিংয়ের কারণে অনেক মানুষ সামাজিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের অনলাইন হয়রানি, অপমান, হুমকি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ঘটনা তাঁদের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। 

অনেক ক্ষেত্রে এসব হয়রানির পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। ফলে সাইবার বুলিংকে নিছক অনলাইন কৌতুক বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

আগে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সন্ত্রাসী বা মাস্তান ব্যবহার করার ঘটনা দেখা যেত। এখন প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সেই প্রবণতার নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কাউকে হেয় করা, ভয় দেখানো, চরিত্রহনন করা কিংবা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নারীদের ক্ষেত্রেও অনলাইন হয়রানি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুধু নারী কিংবা ব্যক্তিগত পর্যায়ের মানুষই নয়, সাইবার অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রদায়ও। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, মাজার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ নানা স্পর্শকাতর বিষয়কে কেন্দ্র করে ভুল তথ্য ছড়ানোর ঘটনাও দেখা যায়। 

এমনকি মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও অপতথ্য প্রচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড মানুষের মধ্যে ভয়, ক্ষোভ, বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস বাড়াতে পারেন।

তবে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটসের ১৯ নম্বর ধারায় প্রত্যেক মানুষের মতামত রাখা এবং তা প্রকাশের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কী ভাববে এবং কী বলবে—সে বিষয়ে তার মৌলিক অধিকার রয়েছে।

একই সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসের ১৯(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে। অন্যের সুনাম, অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষা কিংবা সমাজের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে আইনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যেতে পারে। 

অর্থাৎ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করে অন্যের অধিকার ও নিরাপত্তা ধ্বংস করার সুযোগও থাকা উচিত নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নাৎসি বাহিনী পরিকল্পিত প্রচারণার মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বিশ্বকে দেখিয়েছে, মিথ্যা প্রচারণা ও ঘৃণার বিস্তার কতটা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির কারণে সেই প্রচারণা আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আগে কোনো অপপ্রচার লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগত। এখন একটি পোস্ট, ভিডিও কিংবা গ্রাফিকস কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব বা অপতথ্যের ক্ষতি অনেক বেশি দ্রুত ও ব্যাপক হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ক্ষতিকর ডিজিটাল কনটেন্ট মোকাবিলায় বিভিন্ন ধরনের আইন ও নীতিমালা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন প্রয়োজন।

এই জায়গায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের উদ্যোগটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ সরকার যদি একদিকে সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয় এবং অন্যদিকে আইনটির অপব্যবহার রোধে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করে, তাহলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

আইনটি চূড়ান্ত করার আগে বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের মতামত গ্রহণের উদ্যোগ সরকারের আন্তরিকতার বিষয়টি স্পষ্ট করে। জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে আইন প্রণয়নের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হলে আইনটির গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।

সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়াও প্রয়োজন। কারণ একটি ভালো সাইবার আইন শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়; একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নারী, শিশু এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যও প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যে সাইবার অপরাধকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং আইন সংশোধনের আগে বিভিন্ন মহলের মতামত নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, তা সরকারের সদিচ্ছা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করে। এখন প্রয়োজন সেই উদ্যোগকে বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকর করা।

সাইবারজগতে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনও পূর্ণাঙ্গভাবে সুরক্ষিত রাখা কঠিন। তাই সাইবার সন্ত্রাস, গুজব, অপতথ্য, বুলিং, মানহানি ও অনলাইন চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইন প্রণয়নই হওয়া উচিত সরকারের লক্ষ্য।

এই বাস্তবতায় সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ শুধু একটি আইন পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি নাগরিকের ডিজিটাল নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সরকারের সদিচ্ছা, অংশীজনের মতামত এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে একটি কার্যকর আইন প্রণয়ন সম্ভব হলে সাইবার অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্যও একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত