একসময় মাত্র ৯০ ফুট গভীরেই মিলত ভূগর্ভস্থ পানি। সময়ের সঙ্গে সেই পানি যেন মাটির আরও গভীরে সরে গেছে। এখন কোথাও ১২০ ফুট, কোথাও ৩০০ ফুট, আবার কোনো কোনো এলাকায় ১ হাজার ৪০০ ফুট পর্যন্ত গভীরে নলকূপ বসিয়েও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। যে গভীর নলকূপ দিয়ে একসময় ১৫০ থেকে ১৮০ বিঘা জমিতে অনায়াসে সেচ দেওয়া যেত, অনেক এলাকায় এখন সেই নলকূপ দিয়ে পানি দেওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯০ থেকে ১১০ বিঘা জমিতে। এতে শুধু সেচব্যবস্থাই সংকুচিত হচ্ছে না, বদলে যাচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির চেহারা, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, কমছে বোরো আবাদ। একই সঙ্গে খাবার পানির সংকটও তীব্র হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে দেশের খরাপ্রবণ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ায় কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
সরকারি হিসাবে, নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫টি উপজেলার ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানিসংকট’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আরও ৮৮৪টি মৌজাকে ‘উচ্চ’ এবং ১ হাজার ২৪০টি মৌজাকে ‘মাঝারি’ পানিসংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব এলাকায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। বিশেষ করে নওগাঁর নিয়ামতপুর, পোরশা, পত্নীতলা, ধামইরহাট ও সাপাহার উপজেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। এসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, নলকূপের গভীরতা বাড়িয়েও অনেক স্থানে কাঙ্ক্ষিত পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। কয়েক দশক ধরে কৃষি, খাবার পানি ও অন্যান্য কাজে অতিরিক্ত হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে ধীরে ধীরে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। অনুমোদিত সীমার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অগভীর ও গভীর নলকূপ স্থাপন করায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর তৈরি হয়েছে অতিরিক্ত চাপ। বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির নিচে যতটুকু পানি প্রাকৃতিকভাবে পুনঃভরণ বা রিচার্জ হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে প্রতিবছর পানির ঘাটতি আরও বাড়ছে।
নওগাঁর পোরশা উপজেলার শিয়ালডাঙ্গা গ্রামের গভীর নলকূপ পরিচালনাকারী সাইফুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে চোখের সামনে পানির স্তরের এই পরিবর্তন দেখছেন। তার নলকূপে একসময় ৯০ ফুট গভীর থেকেই পানি উঠত। পরে নলকূপের গভীরতা বাড়িয়ে ১১০ ফুট এবং এরপর ১২০ ফুট করতে হয়েছে। তারপরও আগের মতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। তার ভাষায়, যেভাবে পানির স্তর নিচে নামছে, তাতে মনে হচ্ছে কিছুদিন পর আর তোলার মতো পানি থাকবে না। তার এই আশঙ্কা এখন শুধু একজন নলকূপ পরিচালনাকারীর নয়; বরেন্দ্র অঞ্চলের বহু কৃষক ও বাসিন্দার একই উদ্বেগ।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও পরিস্থিতির অবনতির চিত্র স্পষ্ট। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ২৯ দশমিক ০৯ মিটার। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তা নেমে হয়েছে ৩১ দশমিক ০৪ মিটার। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পানির স্তর আরও নিচে নেমেছে। একই সময়ে সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির উল্লেখযোগ্য পুনঃভরণও হয়নি। ফলে বরেন্দ্রের মাটির নিচে পানির যে মজুত রয়েছে, তার ওপর বাড়ছে চাপ।
পানির এই সংকটের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ছে কৃষিতে। বরেন্দ্র অঞ্চল মূলত সেচনির্ভর কৃষির ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধানের আবাদে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি প্রয়োজন হয়। কিন্তু পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় একই নলকূপ দিয়ে আগের মতো বিস্তীর্ণ জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যে গভীর নলকূপ দিয়ে একসময় ১৫০ থেকে ১৮০ বিঘা জমিতে পানি দেওয়া যেত, এখন অনেক এলাকায় তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯০ থেকে ১১০ বিঘায়। ফলে সেচের আওতায় জমির পরিমাণ কমছে, বাড়ছে কৃষকের খরচ। অনেক কৃষক বোরো চাষ কমিয়ে দিচ্ছেন, কেউ কম পানি প্রয়োজন এমন ফসল চাষ করছেন, আবার কেউ কেউ জমি অনাবাদি রাখছেন।
এই পরিবর্তনের প্রভাব নওগাঁর কৃষির পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে নওগাঁয় ধান চাষের জমির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪৬৫ হেক্টর। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৫০ হেক্টরে। অর্থাৎ কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ কমেছে। এর বিপরীতে দ্রুত বাড়ছে আমের আবাদ। ২০১৬ সালের দিকে নওগাঁয় আম চাষের জমি ছিল প্রায় ৬ হাজার হেক্টর। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টরে। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে আমবাগানের আওতা কয়েক গুণ বেড়েছে।
নওগাঁর কৃষিতে গমের আবাদেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমিতে গম চাষ হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমিতে গমের আবাদ কমেছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, পানির ব্যবহার কমাতে কৃষকেরা ধানসহ বেশি পানি প্রয়োজন এমন ফসলের পরিবর্তে বিভিন্ন বিকল্প ফসল ও আমবাগানের দিকে ঝুঁকছেন। সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও ধামইরহাটে এই পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, ধানের তুলনায় কম পানি প্রয়োজন হওয়ায় এসব উপজেলায় আম, গমসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ বাড়ছে। বেশি পানি ব্যবহার হয় এমন ফসলের পরিবর্তে কৃষকেরা বিকল্প ফসল চাষ করছেন। পাশাপাশি অনেকে কৃষির পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছেন। তবে কৃষির ধরন বদলে যাওয়ার এই প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এর পেছনে পানিসংকটও বড় একটি কারণ হিসেবে কাজ করছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার পানিসংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বাংলাদেশ পানি আইন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে ১০ বছরের জন্য পানিসংকটাপন্ন অঞ্চল ঘোষণা করে ১১টি বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। পানীয় জল ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নতুন নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফসলের বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে পরিবেশবাদীদের মতে, শুধু আইন বা বিধিনিষেধ থাকলেই হবে না। মাঠপর্যায়ে এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নাইস পারভিন পানিসংকট মোকাবিলায় বিধিনিষেধ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, আধুনিক কৃষিপদ্ধতি চালু এবং পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে এত বড় সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান মনে করেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তাঁর মতে, খাল, বিল ও পুকুর পুনঃখনন করতে হবে, বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা বাড়াতে হবে, কৃষিকে কম পানি প্রয়োজন এমন ফসলের দিকে নিতে হবে এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন নলকূপের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শুধু নলকূপ আরও গভীরে বসিয়ে পানি তোলার মাধ্যমে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) জানিয়েছে, প্রায় এক লাখ হেক্টর জমি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তবে সংস্থাটির দাবি, এখনো বোরো উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েনি। বিএমডিএর নওগাঁ অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, সেচ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং পরিস্থিতি এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে গভীর নলকূপ বন্ধ করে দিতে হবে।
এদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে উন্নয়ন সংস্থাগুলোও বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। কোকা-কোলা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ডাসকো ফাউন্ডেশনের ‘সওয়াব’ প্রকল্প নিয়ামতপুর ও গোমস্তাপুরের ১৩টি ইউনিয়নে নিরাপদ পানি সরবরাহ, পুকুর পুনঃখনন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরণ নিয়ে কাজ করছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম খান জানান, এরই মধ্যে ৩৪টি কমিউনিটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, চারটি স্কুল ওয়াশ ব্লক, দুটি কমিউনিটি ক্লিনিকে পানি সুবিধা, ২০টি পুকুর পুনঃখনন এবং ১০টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ৩৮ হাজার ৯৭০ মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।
নওগাঁয় নিরাপদ খাবার পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতেও সরকারি উদ্যোগ রয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরণের জন্য জলবায়ু সহনশীল বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জেলায় বর্তমানে ২ হাজার ১০৭টি পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৩ হাজার লিটার। একই সঙ্গে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে কমিউনিটিভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে পানির অপচয় কমানো যায় এবং একটি উৎস থেকে বেশি মানুষ পরিকল্পিতভাবে পানি ব্যবহার করতে পারেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁয় ইতোমধ্যে ১৬টি খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। আরও পাঁচটি খালের খননকাজ শিগগিরই শুরু হবে। এসব খালে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা গেলে তা একদিকে স্থানীয় জলাধারগুলোকে সচল করবে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরণেও ভূমিকা রাখবে। পানি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমেও প্রচার চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও নিরাপদ পানি ও পানি সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছে।

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬
একসময় মাত্র ৯০ ফুট গভীরেই মিলত ভূগর্ভস্থ পানি। সময়ের সঙ্গে সেই পানি যেন মাটির আরও গভীরে সরে গেছে। এখন কোথাও ১২০ ফুট, কোথাও ৩০০ ফুট, আবার কোনো কোনো এলাকায় ১ হাজার ৪০০ ফুট পর্যন্ত গভীরে নলকূপ বসিয়েও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। যে গভীর নলকূপ দিয়ে একসময় ১৫০ থেকে ১৮০ বিঘা জমিতে অনায়াসে সেচ দেওয়া যেত, অনেক এলাকায় এখন সেই নলকূপ দিয়ে পানি দেওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯০ থেকে ১১০ বিঘা জমিতে। এতে শুধু সেচব্যবস্থাই সংকুচিত হচ্ছে না, বদলে যাচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির চেহারা, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, কমছে বোরো আবাদ। একই সঙ্গে খাবার পানির সংকটও তীব্র হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে দেশের খরাপ্রবণ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ায় কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
সরকারি হিসাবে, নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫টি উপজেলার ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানিসংকট’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আরও ৮৮৪টি মৌজাকে ‘উচ্চ’ এবং ১ হাজার ২৪০টি মৌজাকে ‘মাঝারি’ পানিসংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব এলাকায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। বিশেষ করে নওগাঁর নিয়ামতপুর, পোরশা, পত্নীতলা, ধামইরহাট ও সাপাহার উপজেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। এসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, নলকূপের গভীরতা বাড়িয়েও অনেক স্থানে কাঙ্ক্ষিত পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। কয়েক দশক ধরে কৃষি, খাবার পানি ও অন্যান্য কাজে অতিরিক্ত হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে ধীরে ধীরে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। অনুমোদিত সীমার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অগভীর ও গভীর নলকূপ স্থাপন করায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর তৈরি হয়েছে অতিরিক্ত চাপ। বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির নিচে যতটুকু পানি প্রাকৃতিকভাবে পুনঃভরণ বা রিচার্জ হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে প্রতিবছর পানির ঘাটতি আরও বাড়ছে।
নওগাঁর পোরশা উপজেলার শিয়ালডাঙ্গা গ্রামের গভীর নলকূপ পরিচালনাকারী সাইফুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে চোখের সামনে পানির স্তরের এই পরিবর্তন দেখছেন। তার নলকূপে একসময় ৯০ ফুট গভীর থেকেই পানি উঠত। পরে নলকূপের গভীরতা বাড়িয়ে ১১০ ফুট এবং এরপর ১২০ ফুট করতে হয়েছে। তারপরও আগের মতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। তার ভাষায়, যেভাবে পানির স্তর নিচে নামছে, তাতে মনে হচ্ছে কিছুদিন পর আর তোলার মতো পানি থাকবে না। তার এই আশঙ্কা এখন শুধু একজন নলকূপ পরিচালনাকারীর নয়; বরেন্দ্র অঞ্চলের বহু কৃষক ও বাসিন্দার একই উদ্বেগ।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও পরিস্থিতির অবনতির চিত্র স্পষ্ট। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ২৯ দশমিক ০৯ মিটার। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তা নেমে হয়েছে ৩১ দশমিক ০৪ মিটার। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পানির স্তর আরও নিচে নেমেছে। একই সময়ে সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির উল্লেখযোগ্য পুনঃভরণও হয়নি। ফলে বরেন্দ্রের মাটির নিচে পানির যে মজুত রয়েছে, তার ওপর বাড়ছে চাপ।
পানির এই সংকটের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ছে কৃষিতে। বরেন্দ্র অঞ্চল মূলত সেচনির্ভর কৃষির ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধানের আবাদে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি প্রয়োজন হয়। কিন্তু পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় একই নলকূপ দিয়ে আগের মতো বিস্তীর্ণ জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যে গভীর নলকূপ দিয়ে একসময় ১৫০ থেকে ১৮০ বিঘা জমিতে পানি দেওয়া যেত, এখন অনেক এলাকায় তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯০ থেকে ১১০ বিঘায়। ফলে সেচের আওতায় জমির পরিমাণ কমছে, বাড়ছে কৃষকের খরচ। অনেক কৃষক বোরো চাষ কমিয়ে দিচ্ছেন, কেউ কম পানি প্রয়োজন এমন ফসল চাষ করছেন, আবার কেউ কেউ জমি অনাবাদি রাখছেন।
এই পরিবর্তনের প্রভাব নওগাঁর কৃষির পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে নওগাঁয় ধান চাষের জমির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪৬৫ হেক্টর। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৫০ হেক্টরে। অর্থাৎ কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ কমেছে। এর বিপরীতে দ্রুত বাড়ছে আমের আবাদ। ২০১৬ সালের দিকে নওগাঁয় আম চাষের জমি ছিল প্রায় ৬ হাজার হেক্টর। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টরে। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে আমবাগানের আওতা কয়েক গুণ বেড়েছে।
নওগাঁর কৃষিতে গমের আবাদেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমিতে গম চাষ হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমিতে গমের আবাদ কমেছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, পানির ব্যবহার কমাতে কৃষকেরা ধানসহ বেশি পানি প্রয়োজন এমন ফসলের পরিবর্তে বিভিন্ন বিকল্প ফসল ও আমবাগানের দিকে ঝুঁকছেন। সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও ধামইরহাটে এই পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, ধানের তুলনায় কম পানি প্রয়োজন হওয়ায় এসব উপজেলায় আম, গমসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ বাড়ছে। বেশি পানি ব্যবহার হয় এমন ফসলের পরিবর্তে কৃষকেরা বিকল্প ফসল চাষ করছেন। পাশাপাশি অনেকে কৃষির পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছেন। তবে কৃষির ধরন বদলে যাওয়ার এই প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এর পেছনে পানিসংকটও বড় একটি কারণ হিসেবে কাজ করছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার পানিসংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বাংলাদেশ পানি আইন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে ১০ বছরের জন্য পানিসংকটাপন্ন অঞ্চল ঘোষণা করে ১১টি বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। পানীয় জল ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নতুন নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফসলের বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে পরিবেশবাদীদের মতে, শুধু আইন বা বিধিনিষেধ থাকলেই হবে না। মাঠপর্যায়ে এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নাইস পারভিন পানিসংকট মোকাবিলায় বিধিনিষেধ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, আধুনিক কৃষিপদ্ধতি চালু এবং পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে এত বড় সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান মনে করেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তাঁর মতে, খাল, বিল ও পুকুর পুনঃখনন করতে হবে, বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা বাড়াতে হবে, কৃষিকে কম পানি প্রয়োজন এমন ফসলের দিকে নিতে হবে এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন নলকূপের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শুধু নলকূপ আরও গভীরে বসিয়ে পানি তোলার মাধ্যমে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) জানিয়েছে, প্রায় এক লাখ হেক্টর জমি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তবে সংস্থাটির দাবি, এখনো বোরো উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েনি। বিএমডিএর নওগাঁ অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, সেচ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং পরিস্থিতি এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে গভীর নলকূপ বন্ধ করে দিতে হবে।
এদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে উন্নয়ন সংস্থাগুলোও বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। কোকা-কোলা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ডাসকো ফাউন্ডেশনের ‘সওয়াব’ প্রকল্প নিয়ামতপুর ও গোমস্তাপুরের ১৩টি ইউনিয়নে নিরাপদ পানি সরবরাহ, পুকুর পুনঃখনন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরণ নিয়ে কাজ করছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম খান জানান, এরই মধ্যে ৩৪টি কমিউনিটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, চারটি স্কুল ওয়াশ ব্লক, দুটি কমিউনিটি ক্লিনিকে পানি সুবিধা, ২০টি পুকুর পুনঃখনন এবং ১০টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ৩৮ হাজার ৯৭০ মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।
নওগাঁয় নিরাপদ খাবার পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতেও সরকারি উদ্যোগ রয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরণের জন্য জলবায়ু সহনশীল বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জেলায় বর্তমানে ২ হাজার ১০৭টি পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৩ হাজার লিটার। একই সঙ্গে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে কমিউনিটিভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে পানির অপচয় কমানো যায় এবং একটি উৎস থেকে বেশি মানুষ পরিকল্পিতভাবে পানি ব্যবহার করতে পারেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁয় ইতোমধ্যে ১৬টি খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। আরও পাঁচটি খালের খননকাজ শিগগিরই শুরু হবে। এসব খালে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা গেলে তা একদিকে স্থানীয় জলাধারগুলোকে সচল করবে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরণেও ভূমিকা রাখবে। পানি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমেও প্রচার চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও নিরাপদ পানি ও পানি সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছে।

আপনার মতামত লিখুন