জয়পুরহাট    শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
Daily Joypur Barta

নদীতে শিশুর মরদেহ, তিন দিনের হিসাব মেলাতে পারছে না কেউ



নদীতে শিশুর মরদেহ, তিন দিনের হিসাব মেলাতে পারছে না কেউ
ছবি: প্রতিনিধি

মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর কথা বলে ১০ বছরের শিশু তাসফিয়াকে রেখে গিয়েছিলেন সৎ বাবা শাফিউল। দুই দিন পর আবার মাদ্রাসায় এসে শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যান তিনি। ওই রাতেই শাফিউলের মোবাইল ফোন থেকে মাদ্রাসার পরিচালিকার সঙ্গে কথা বলে তাসফিয়া। সেখানে তাকে বিরামপুরে ভর্তি করানোর কথা জানানো হয়। এর পরদিন রাতে করতোয়া নদী থেকে উদ্ধার হয় তাসফিয়ার মরদেহ।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঘোড়াঘাট উপজেলার রানীগঞ্জ জুবাইদা বালিকা মাদ্রাসায় তাসফিয়াকে নিয়ে যান শাফিউল। মাদ্রাসার পরিচালিকা রমিছা জানান, ওই সময় শাফিউল নিজেকে তাসফিয়ার সৎ বাবা পরিচয় দিয়ে বলেন, শিশুটিকে মাদ্রাসায় ভর্তি করাবেন। তার ও শিশুটির মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার কথা বলে তাসফিয়াকে সেদিন রাতে মাদ্রাসায় রাখার অনুরোধ করেন তিনি।

“বাচ্চাটা তখন খুব কান্নাকাটি করছিল। আমি ওকে কান্না থামাতে বলি। লোকটিকে আমি চিনিও না, জানিও না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাচ্চাটাকে রেখে তিনি দ্রুত বের হয়ে যান”—বলেন পরিচালিকা রমিছা।

শাফিউল চলে যাওয়ার পর তাকে খুঁজতে বাইরে বের হয়েও তাকে পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

পরদিন শনিবার (১৫ আগস্ট) শাফিউল মাদ্রাসায় না আসায় তাসফিয়াকে নিয়ে তার ভর্ণাপাড়ার বাড়িতে যান পরিচালিকা। সেখানে শিশুটির সৎ দাদিসহ কয়েকজন নারীকে পাওয়া যায়। তারা তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে কোনো আপত্তি নেই বলে জানান। শাফিউল তখন বাড়িতে ছিলেন না। সেখান থেকেই শিশুটির মায়ের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেন পরিচালিকা। একাধিকবার ফোন করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

পরে তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ফিরে আসার কথা বললে সে কাপড়চোপড় নিয়ে পরিচালিকার সঙ্গে চলে আসে।

সেদিন সন্ধ্যার পর শাফিউল মাদ্রাসার নম্বরে ফোন করেন। পরিচালিকা তাকে জানান, এভাবে কাউকে না জানিয়ে শিশুকে রেখে যাওয়া সম্ভব নয়। পরে শাফিউল মাদ্রাসায় এসে বলেন, তিনি ইচ্ছা করেই তাসফিয়াকে সেখানে রেখে গিয়েছিলেন। কারণ, তিনি গেলে শিশুটি হয়তো তার সঙ্গে বাড়ি চলে যেতে চাইত।

পরিচালিকার ভাষ্য, ওই সময় শাফিউল তাকে বিশেষভাবে বলেন, তাসফিয়ার মা বা রংপুর থেকে কোনো আত্মীয় এলে যেন শিশুটিকে তাদের সঙ্গে যেতে না দেওয়া হয়। এমনকি কেউ শিশুটির বিষয়ে জানতে চাইলে যেন তাকে জানানো হয়। প্রয়োজনীয় সবকিছু তিনি দেখবেন বলেও জানান।

পরিচালিকা বলেন, রংপুরে তাসফিয়ার মায়ের আগের বিয়ে হয়েছিল। সেখানকার আত্মীয়রা শিশুটিকে নিয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা শাফিউল তাকে জানিয়েছিলেন।

এরপর আসে রোববার (১৬ আগস্ট)। দুপুরে শাফিউল আবার মাদ্রাসায় গিয়ে তাসফিয়াকে ৫০ টাকা ও কিছু চকলেট দেন। সন্ধ্যার পর তিনি ফের মাদ্রাসায় যান। সেদিন পরিচালিকা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে থাকায় মাদ্রাসার দায়িত্বে ছিলেন অন্য এক শিক্ষিকা।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, শাফিউল তার নিজের এবং তাসফিয়ার মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র মাদ্রাসায় রেখে ছবি তোলা ও শিশুটির জন্য ট্রাঙ্ক কেনার কথা বলে তাসফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যান। মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজেও শিশুটিকে তার সঙ্গে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে বলে জানান পরিচালিকা।

রোববার রাত ৯টা ১৬ মিনিটে শাফিউলের মোবাইল নম্বর থেকেই মাদ্রাসার পরিচালিকার নম্বরে ফোন আসে। ফোনে তাসফিয়া কথা বলে জানায়, তার বাবা তাকে বিরামপুরে ভর্তি করে দিয়েছেন। পরিচালিকার দাবি, কথোপকথনের সময় তার মনে হয়েছে, শিশুটির পাশে থাকা কেউ তাকে কথা বলার বিষয়গুলো বলে দিচ্ছিল।

পরে আবার ফোন করা হলে তাসফিয়া জানায়, তার বাবা তাকে নতুন কাপড় কিনে দিয়েছেন। এরপর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের আর যোগাযোগ হয়নি।

পরদিন সোমবার (১৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘোড়াঘাট উপজেলার ৩ নম্বর সিংড়া ইউনিয়নের ভর্ণাপাড়া টঙ্গী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন করতোয়া নদী থেকে লাল জামা পরা অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পরিচয় শনাক্ত করে জানা যায়, মরদেহটি তাসফিয়ার।

মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর মাদ্রাসার পরিচালিকা সিসিটিভি ফুটেজসহ আগের ঘটনাগুলো মিলিয়ে দেখেন। তার দাবি, তাসফিয়াকে সর্বশেষ মাদ্রাসা থেকে শাফিউলই নিয়ে গিয়েছিলেন।

ঘটনার পর শাফিউলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া যায়। তিনি দাবি করেন, তাসফিয়ার জন্য ট্রাঙ্ক ও কাপড় কিনে তাকে মাদ্রাসায় দিয়ে এসেছেন। তাকে সিসিটিভি ফুটেজে শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে বের হতে দেখা যাওয়ার কথা জানালে তিনি বলেন, তাসফিয়াকে একাই ভ্যানে করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। নিজে কেন যাননি জানতে চাইলে ইউনিয়ন পরিষদে তার কাজ ছিল বলে জানান। সেখানে গিয়ে চেয়ারম্যানকে পাননি বলেও দাবি করেন তিনি।

আবার মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে কেন বিরামপুরে ভর্তি করানোর কথা বলা হয়েছিল—এ প্রশ্নে শাফিউল জানান, তাসফিয়ার মা ও রংপুরের আত্মীয়রা যেন বিষয়টি জানতে না পারেন, সে জন্য শিশুটিকে সেভাবে কথা বলতে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে, শাফিউল বর্তমানে ঢাকায় আছেন বলে জানান। তাসফিয়ার মৃত্যুর খবর কখন জানতে পেরেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরে জেনেছেন। তার দাবি, শিশুটির মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ করে দুজন একসঙ্গে আসবেন। তবে তাসফিয়ার মায়ের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

ঘটনার অনুসন্ধানে শাফিউলের ভর্ণাপাড়ার বাড়িতে গিয়ে তার মা ছালেমা বেগমের সঙ্গেও কথা হয়। তিনি জানান, রোববার রাতে শাফিউল আনুমানিক রাত ১টার দিকে বাড়িতে ফেরেন। এত রাতে সাধারণত তিনি বাড়িতে ফেরেন না। সেদিন তাকে অস্বাভাবিক দেখাচ্ছিল এবং নেশাগ্রস্ত মনে হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

ছালেমা বেগম বলেন, ওই রাতে ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলে সে তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিয়ে আসার কথা জানায়। পরে সোমবার রাতে তার স্বামী মোসলেম উদ্দিন নদীতে মাছ ধরতে গেলে শিশুর মরদেহ উদ্ধারের খবর পান। বাড়িতে ফিরে বিষয়টি জানালে শাফিউলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন তারা।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাসফিয়ার মরদেহ নদীতে পাওয়ার কথা জানার পর শাফিউল তাকে মাদ্রাসার খোঁজ নিতে বলেন। পরে মাদ্রাসায় যোগাযোগ করে জানতে পারেন, তাসফিয়াকে শাফিউলই নিয়ে গেছেন।

নিজের ছেলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে ছালেমা বেগম বলেন, “আমি মা হয়ে সাক্ষী দিচ্ছি, ওই বাচ্চার সঙ্গে সে অন্যায় করেছে। আমি ওর কঠিন শাস্তি চাই।”

এদিকে শাফিউলের ভর্ণাপাড়া গ্রামে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেও কথা বলে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েকজন বাসিন্দা তাসফিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় শাফিউলকে সন্দেহ করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি সদস্য দাবি করেন, শাফিউলের বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক অপরাধের অভিযোগ রয়েছে এবং বিভিন্ন সময় পুলিশ তাকে ধরতে এলাকায় এসেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন নথিপত্র এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ঘটনার রাতে নদীর আশপাশেও শাফিউলকে দেখা গেছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তারা প্রকাশ্যে নাম বলতে চাননি। অনুসন্ধানের সময় রাত আনুমানিক ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে শাফিউলকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল বলেও কয়েকজনের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

তাসফিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—১৪ আগস্ট শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মাদ্রাসায় রেখে যাওয়ার পর থেকে ১৭ আগস্ট সোমবার রাতে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত শিশুটি কোথায় ছিল?

মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজে ১৬ আগস্ট সন্ধ্যায় তাসফিয়াকে শাফিউলের সঙ্গে বের হতে দেখা গেছে। একই রাতে শাফিউলের মোবাইল থেকে মাদ্রাসায় ফোন করে শিশুটির সঙ্গে কথা বলানো হয়েছে। এরপর সোমবার রাতে নদী থেকে উদ্ধার হয়েছে তার মরদেহ।

এই প্রায় তিন দিনের সময়ের মধ্যে তাসফিয়ার অবস্থান, তার সঙ্গে কারা ছিল এবং কীভাবে তার মরদেহ করতোয়া নদীতে গেল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

এ বিষয়ে সিংড়া ইউপি চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন বলেন,  এটি একটি নিঃসন্দেহে হত্যাকাণ্ড, এ হত্যার পিছনে কারা কারা দায়ী, প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা  প্রয়োজন।  আমি মনে করি প্রকৃত অপরাধীকে সনাক্ত করে আইনের আওতায় দ্রুত আনা উচিত। 

ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, শিশুটির পরিচয় পাওয়ার আগেই মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছিল। পরে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ওসি বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তাসফিয়ার মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তবে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার পর তার গতিপথ এবং শাফিউলের বক্তব্যের অসঙ্গতিগুলো তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১৪ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট—এই তিন দিনের অজানা সময়ের উত্তরই হয়তো তাসফিয়ার মৃত্যুর রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। 

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬


নদীতে শিশুর মরদেহ, তিন দিনের হিসাব মেলাতে পারছে না কেউ

প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর কথা বলে ১০ বছরের শিশু তাসফিয়াকে রেখে গিয়েছিলেন সৎ বাবা শাফিউল। দুই দিন পর আবার মাদ্রাসায় এসে শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যান তিনি। ওই রাতেই শাফিউলের মোবাইল ফোন থেকে মাদ্রাসার পরিচালিকার সঙ্গে কথা বলে তাসফিয়া। সেখানে তাকে বিরামপুরে ভর্তি করানোর কথা জানানো হয়। এর পরদিন রাতে করতোয়া নদী থেকে উদ্ধার হয় তাসফিয়ার মরদেহ।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঘোড়াঘাট উপজেলার রানীগঞ্জ জুবাইদা বালিকা মাদ্রাসায় তাসফিয়াকে নিয়ে যান শাফিউল। মাদ্রাসার পরিচালিকা রমিছা জানান, ওই সময় শাফিউল নিজেকে তাসফিয়ার সৎ বাবা পরিচয় দিয়ে বলেন, শিশুটিকে মাদ্রাসায় ভর্তি করাবেন। তার ও শিশুটির মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার কথা বলে তাসফিয়াকে সেদিন রাতে মাদ্রাসায় রাখার অনুরোধ করেন তিনি।

“বাচ্চাটা তখন খুব কান্নাকাটি করছিল। আমি ওকে কান্না থামাতে বলি। লোকটিকে আমি চিনিও না, জানিও না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাচ্চাটাকে রেখে তিনি দ্রুত বের হয়ে যান”—বলেন পরিচালিকা রমিছা।

শাফিউল চলে যাওয়ার পর তাকে খুঁজতে বাইরে বের হয়েও তাকে পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

পরদিন শনিবার (১৫ আগস্ট) শাফিউল মাদ্রাসায় না আসায় তাসফিয়াকে নিয়ে তার ভর্ণাপাড়ার বাড়িতে যান পরিচালিকা। সেখানে শিশুটির সৎ দাদিসহ কয়েকজন নারীকে পাওয়া যায়। তারা তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে কোনো আপত্তি নেই বলে জানান। শাফিউল তখন বাড়িতে ছিলেন না। সেখান থেকেই শিশুটির মায়ের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেন পরিচালিকা। একাধিকবার ফোন করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

পরে তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ফিরে আসার কথা বললে সে কাপড়চোপড় নিয়ে পরিচালিকার সঙ্গে চলে আসে।

সেদিন সন্ধ্যার পর শাফিউল মাদ্রাসার নম্বরে ফোন করেন। পরিচালিকা তাকে জানান, এভাবে কাউকে না জানিয়ে শিশুকে রেখে যাওয়া সম্ভব নয়। পরে শাফিউল মাদ্রাসায় এসে বলেন, তিনি ইচ্ছা করেই তাসফিয়াকে সেখানে রেখে গিয়েছিলেন। কারণ, তিনি গেলে শিশুটি হয়তো তার সঙ্গে বাড়ি চলে যেতে চাইত।

পরিচালিকার ভাষ্য, ওই সময় শাফিউল তাকে বিশেষভাবে বলেন, তাসফিয়ার মা বা রংপুর থেকে কোনো আত্মীয় এলে যেন শিশুটিকে তাদের সঙ্গে যেতে না দেওয়া হয়। এমনকি কেউ শিশুটির বিষয়ে জানতে চাইলে যেন তাকে জানানো হয়। প্রয়োজনীয় সবকিছু তিনি দেখবেন বলেও জানান।

পরিচালিকা বলেন, রংপুরে তাসফিয়ার মায়ের আগের বিয়ে হয়েছিল। সেখানকার আত্মীয়রা শিশুটিকে নিয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা শাফিউল তাকে জানিয়েছিলেন।

এরপর আসে রোববার (১৬ আগস্ট)। দুপুরে শাফিউল আবার মাদ্রাসায় গিয়ে তাসফিয়াকে ৫০ টাকা ও কিছু চকলেট দেন। সন্ধ্যার পর তিনি ফের মাদ্রাসায় যান। সেদিন পরিচালিকা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে থাকায় মাদ্রাসার দায়িত্বে ছিলেন অন্য এক শিক্ষিকা।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, শাফিউল তার নিজের এবং তাসফিয়ার মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র মাদ্রাসায় রেখে ছবি তোলা ও শিশুটির জন্য ট্রাঙ্ক কেনার কথা বলে তাসফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যান। মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজেও শিশুটিকে তার সঙ্গে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে বলে জানান পরিচালিকা।

রোববার রাত ৯টা ১৬ মিনিটে শাফিউলের মোবাইল নম্বর থেকেই মাদ্রাসার পরিচালিকার নম্বরে ফোন আসে। ফোনে তাসফিয়া কথা বলে জানায়, তার বাবা তাকে বিরামপুরে ভর্তি করে দিয়েছেন। পরিচালিকার দাবি, কথোপকথনের সময় তার মনে হয়েছে, শিশুটির পাশে থাকা কেউ তাকে কথা বলার বিষয়গুলো বলে দিচ্ছিল।

পরে আবার ফোন করা হলে তাসফিয়া জানায়, তার বাবা তাকে নতুন কাপড় কিনে দিয়েছেন। এরপর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের আর যোগাযোগ হয়নি।

পরদিন সোমবার (১৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘোড়াঘাট উপজেলার ৩ নম্বর সিংড়া ইউনিয়নের ভর্ণাপাড়া টঙ্গী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন করতোয়া নদী থেকে লাল জামা পরা অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পরিচয় শনাক্ত করে জানা যায়, মরদেহটি তাসফিয়ার।

মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর মাদ্রাসার পরিচালিকা সিসিটিভি ফুটেজসহ আগের ঘটনাগুলো মিলিয়ে দেখেন। তার দাবি, তাসফিয়াকে সর্বশেষ মাদ্রাসা থেকে শাফিউলই নিয়ে গিয়েছিলেন।

ঘটনার পর শাফিউলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া যায়। তিনি দাবি করেন, তাসফিয়ার জন্য ট্রাঙ্ক ও কাপড় কিনে তাকে মাদ্রাসায় দিয়ে এসেছেন। তাকে সিসিটিভি ফুটেজে শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে বের হতে দেখা যাওয়ার কথা জানালে তিনি বলেন, তাসফিয়াকে একাই ভ্যানে করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। নিজে কেন যাননি জানতে চাইলে ইউনিয়ন পরিষদে তার কাজ ছিল বলে জানান। সেখানে গিয়ে চেয়ারম্যানকে পাননি বলেও দাবি করেন তিনি।

আবার মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে কেন বিরামপুরে ভর্তি করানোর কথা বলা হয়েছিল—এ প্রশ্নে শাফিউল জানান, তাসফিয়ার মা ও রংপুরের আত্মীয়রা যেন বিষয়টি জানতে না পারেন, সে জন্য শিশুটিকে সেভাবে কথা বলতে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে, শাফিউল বর্তমানে ঢাকায় আছেন বলে জানান। তাসফিয়ার মৃত্যুর খবর কখন জানতে পেরেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরে জেনেছেন। তার দাবি, শিশুটির মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ করে দুজন একসঙ্গে আসবেন। তবে তাসফিয়ার মায়ের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

ঘটনার অনুসন্ধানে শাফিউলের ভর্ণাপাড়ার বাড়িতে গিয়ে তার মা ছালেমা বেগমের সঙ্গেও কথা হয়। তিনি জানান, রোববার রাতে শাফিউল আনুমানিক রাত ১টার দিকে বাড়িতে ফেরেন। এত রাতে সাধারণত তিনি বাড়িতে ফেরেন না। সেদিন তাকে অস্বাভাবিক দেখাচ্ছিল এবং নেশাগ্রস্ত মনে হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

ছালেমা বেগম বলেন, ওই রাতে ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলে সে তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিয়ে আসার কথা জানায়। পরে সোমবার রাতে তার স্বামী মোসলেম উদ্দিন নদীতে মাছ ধরতে গেলে শিশুর মরদেহ উদ্ধারের খবর পান। বাড়িতে ফিরে বিষয়টি জানালে শাফিউলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন তারা।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাসফিয়ার মরদেহ নদীতে পাওয়ার কথা জানার পর শাফিউল তাকে মাদ্রাসার খোঁজ নিতে বলেন। পরে মাদ্রাসায় যোগাযোগ করে জানতে পারেন, তাসফিয়াকে শাফিউলই নিয়ে গেছেন।

নিজের ছেলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে ছালেমা বেগম বলেন, “আমি মা হয়ে সাক্ষী দিচ্ছি, ওই বাচ্চার সঙ্গে সে অন্যায় করেছে। আমি ওর কঠিন শাস্তি চাই।”

এদিকে শাফিউলের ভর্ণাপাড়া গ্রামে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেও কথা বলে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েকজন বাসিন্দা তাসফিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় শাফিউলকে সন্দেহ করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি সদস্য দাবি করেন, শাফিউলের বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক অপরাধের অভিযোগ রয়েছে এবং বিভিন্ন সময় পুলিশ তাকে ধরতে এলাকায় এসেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন নথিপত্র এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ঘটনার রাতে নদীর আশপাশেও শাফিউলকে দেখা গেছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তারা প্রকাশ্যে নাম বলতে চাননি। অনুসন্ধানের সময় রাত আনুমানিক ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে শাফিউলকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল বলেও কয়েকজনের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

তাসফিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—১৪ আগস্ট শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মাদ্রাসায় রেখে যাওয়ার পর থেকে ১৭ আগস্ট সোমবার রাতে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত শিশুটি কোথায় ছিল?

মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজে ১৬ আগস্ট সন্ধ্যায় তাসফিয়াকে শাফিউলের সঙ্গে বের হতে দেখা গেছে। একই রাতে শাফিউলের মোবাইল থেকে মাদ্রাসায় ফোন করে শিশুটির সঙ্গে কথা বলানো হয়েছে। এরপর সোমবার রাতে নদী থেকে উদ্ধার হয়েছে তার মরদেহ।

এই প্রায় তিন দিনের সময়ের মধ্যে তাসফিয়ার অবস্থান, তার সঙ্গে কারা ছিল এবং কীভাবে তার মরদেহ করতোয়া নদীতে গেল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

এ বিষয়ে সিংড়া ইউপি চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন বলেন,  এটি একটি নিঃসন্দেহে হত্যাকাণ্ড, এ হত্যার পিছনে কারা কারা দায়ী, প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা  প্রয়োজন।  আমি মনে করি প্রকৃত অপরাধীকে সনাক্ত করে আইনের আওতায় দ্রুত আনা উচিত। 

ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, শিশুটির পরিচয় পাওয়ার আগেই মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছিল। পরে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ওসি বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তাসফিয়ার মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তবে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার পর তার গতিপথ এবং শাফিউলের বক্তব্যের অসঙ্গতিগুলো তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১৪ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট—এই তিন দিনের অজানা সময়ের উত্তরই হয়তো তাসফিয়ার মৃত্যুর রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। 


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত