জয়পুরহাট    শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬
Daily Joypur Barta

সাতক্ষীরায় এক মাস ধরে পানিবন্দী ৩ হাজার পরিবার



সাতক্ষীরায় এক মাস ধরে পানিবন্দী ৩ হাজার পরিবার
ছবি: প্রতিনিধি

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা শহর ও এর আশপাশের অন্তত সাতটি এলাকায় প্রায় তিন হাজার পরিবার এক মাস ধরে পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। বৃষ্টির পানিনিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় তৈরি হয়েছে এমন পরিস্থিতি। এসব এলাকার রাস্তাঘাট, বাড়ির উঠান এবং কোথাও কোথাও বসতঘরে পানি ঢুকেছে। এতে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন স্থানীয় লোকজন।

ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জানান, সাতক্ষীরা পৌরসভার কামালনগর, ইটাগাছা, পলাশপোল, মেহেদীবাগ, রসুলপুর, রইচপুর ও মধ্য কাটিয়ার নিম্নাঞ্চল এবং সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের শৈলকের বিল-সংলগ্ন এলাকা দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব আলীনুর খান বলেন, প্রায় তিন হাজার পরিবারের অন্তত ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন। পানিনিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ ফিরিয়ে আনা ও কার্যকর ড্রেনেজ–ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

গত জুলাই মাসের শুরুতে টানা দুই সপ্তাহের বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা পৌরসভা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ভয়াবহ জলাবদ্ধতা হয়ে পড়ে। সাতক্ষীরা আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলায় ৪৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ জুলাই এক দিনেই সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয় ১৭৯ মিলিমিটার।

সাতক্ষীরা আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলায় ৪৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ জুলাই এক দিনেই সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয় ১৭৯ মিলিমিটার।

আবহাওয়া দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জুলফিকার আলী বলেন, ১ জুলাই থেকে গতকাল ১৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত জেলায় ৮৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।

শনিবার বিকেলে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘুড্ডেরডাঙ্গী মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বসতবাড়ির চারপাশে দীর্ঘদিনের জমে থাকা পানি। কোথাও পানির ওপর ভাসছে শুকনা পাতা ও আবর্জনা। কয়েকটি টিনের তৈরি ঘরের সামনের অংশও পানিতে ডুবে আছে।

গত বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজেলার তালতলা, মাগুরা ও ইটাগাছা এলাকার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে আছে। সেখানে কথা হয় স্থানীয় তিনজন বাসিন্দার সঙ্গে। তাঁরা বলেন, অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ির ঘের তৈরি করার কারণে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, কালভার্ট ও স্লুইসগেটের সমস্যা এবং নালা (ড্রেনেজ) ভরাট হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

ইটাগাছা এলাকায় রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় কোথাও প্লাস্টিকের ভেলায় পারাপার হচ্ছিলেন লোকজন। স্থানীয় বাসিন্দা আয়েশা বেগম বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে বর্ষা মৌসুম এলেই এমন দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। এবার রান্নাঘরেও পানি ঢুকেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৪-০৫ সাল পর্যন্ত এ এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ছিল না। তখন বিল দিয়ে পানি খালে নেমে যেত। পরে বিভিন্ন স্থানে ঘের নির্মাণের কারণে কালভার্টের মুখে বাধা তৈরি হওয়ায় পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়েছে। একসময় পানিনিষ্কাশনের প্রধান পথ ছিল কৈখালী ও শৈলকের বিল। গত আট-নয় বছরে সেখানে মাছের প্রায় ১৫টি ঘের হওয়ায় পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন বলেন, আগে সারা দিন বৃষ্টি হলেও আধা ঘণ্টায় পানি বেতনা নদীতে নেমে যেত। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে থাকে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য (সাতক্ষীরা–২) আবদুল খালেকের কাছে দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী বাসিন্দারা। গত মঙ্গলবার যুগিপোতা উন্নয়ন সংগঠনের আয়োজনে এক সভায় অংশ নেন তিনি। যুগিপোতা গ্রামে অনুষ্ঠিত ওই সভায় স্থানীয় বাসিন্দদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয়eh প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়া হবে। অনেক জায়গায় নিজেদের জমিতে ঘের বা বাঁধ দিয়ে পানিনিষ্কাশনের পথ বন্ধ করা হচ্ছে। একজন মানুষের জন্য শত মানুষকে কষ্ট পেতে দেওয়া যায় না। বাড়িঘর করার সময়ও পানি চলাচলের পথ রাখতে হবে।

জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও। সম্প্রতি জেলা নাগরিক কমিটি আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় নদী-খালের সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পুনর্খনন, বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ–ব্যবস্থা ও অপরিকল্পিত ঘের নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়।

এদিকে ভুক্তভোগীদের আন্দোলনের মুখে গত মঙ্গলবার কয়েকটি ঘেরের একাংশ কেটে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এটি সাময়িক সমাধান। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, খাল ও পানি চলাচলের পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত না হলে প্রতিবছর একই দুর্ভোগ থাকবে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হবে উল্লেখ করে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ১৮ আগস্ট সাতক্ষীরায় এসে বিষয়গুলো সরেজমিনে দেখবেন। তাঁর পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬


সাতক্ষীরায় এক মাস ধরে পানিবন্দী ৩ হাজার পরিবার

প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬

featured Image

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা শহর ও এর আশপাশের অন্তত সাতটি এলাকায় প্রায় তিন হাজার পরিবার এক মাস ধরে পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। বৃষ্টির পানিনিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় তৈরি হয়েছে এমন পরিস্থিতি। এসব এলাকার রাস্তাঘাট, বাড়ির উঠান এবং কোথাও কোথাও বসতঘরে পানি ঢুকেছে। এতে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন স্থানীয় লোকজন।

ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জানান, সাতক্ষীরা পৌরসভার কামালনগর, ইটাগাছা, পলাশপোল, মেহেদীবাগ, রসুলপুর, রইচপুর ও মধ্য কাটিয়ার নিম্নাঞ্চল এবং সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের শৈলকের বিল-সংলগ্ন এলাকা দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব আলীনুর খান বলেন, প্রায় তিন হাজার পরিবারের অন্তত ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন। পানিনিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ ফিরিয়ে আনা ও কার্যকর ড্রেনেজ–ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

গত জুলাই মাসের শুরুতে টানা দুই সপ্তাহের বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা পৌরসভা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ভয়াবহ জলাবদ্ধতা হয়ে পড়ে। সাতক্ষীরা আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলায় ৪৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ জুলাই এক দিনেই সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয় ১৭৯ মিলিমিটার।

সাতক্ষীরা আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলায় ৪৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ জুলাই এক দিনেই সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয় ১৭৯ মিলিমিটার।

আবহাওয়া দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জুলফিকার আলী বলেন, ১ জুলাই থেকে গতকাল ১৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত জেলায় ৮৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।

শনিবার বিকেলে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘুড্ডেরডাঙ্গী মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বসতবাড়ির চারপাশে দীর্ঘদিনের জমে থাকা পানি। কোথাও পানির ওপর ভাসছে শুকনা পাতা ও আবর্জনা। কয়েকটি টিনের তৈরি ঘরের সামনের অংশও পানিতে ডুবে আছে।

গত বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজেলার তালতলা, মাগুরা ও ইটাগাছা এলাকার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে আছে। সেখানে কথা হয় স্থানীয় তিনজন বাসিন্দার সঙ্গে। তাঁরা বলেন, অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ির ঘের তৈরি করার কারণে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, কালভার্ট ও স্লুইসগেটের সমস্যা এবং নালা (ড্রেনেজ) ভরাট হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

ইটাগাছা এলাকায় রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় কোথাও প্লাস্টিকের ভেলায় পারাপার হচ্ছিলেন লোকজন। স্থানীয় বাসিন্দা আয়েশা বেগম বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে বর্ষা মৌসুম এলেই এমন দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। এবার রান্নাঘরেও পানি ঢুকেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৪-০৫ সাল পর্যন্ত এ এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ছিল না। তখন বিল দিয়ে পানি খালে নেমে যেত। পরে বিভিন্ন স্থানে ঘের নির্মাণের কারণে কালভার্টের মুখে বাধা তৈরি হওয়ায় পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়েছে। একসময় পানিনিষ্কাশনের প্রধান পথ ছিল কৈখালী ও শৈলকের বিল। গত আট-নয় বছরে সেখানে মাছের প্রায় ১৫টি ঘের হওয়ায় পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন বলেন, আগে সারা দিন বৃষ্টি হলেও আধা ঘণ্টায় পানি বেতনা নদীতে নেমে যেত। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে থাকে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য (সাতক্ষীরা–২) আবদুল খালেকের কাছে দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী বাসিন্দারা। গত মঙ্গলবার যুগিপোতা উন্নয়ন সংগঠনের আয়োজনে এক সভায় অংশ নেন তিনি। যুগিপোতা গ্রামে অনুষ্ঠিত ওই সভায় স্থানীয় বাসিন্দদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয়eh প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়া হবে। অনেক জায়গায় নিজেদের জমিতে ঘের বা বাঁধ দিয়ে পানিনিষ্কাশনের পথ বন্ধ করা হচ্ছে। একজন মানুষের জন্য শত মানুষকে কষ্ট পেতে দেওয়া যায় না। বাড়িঘর করার সময়ও পানি চলাচলের পথ রাখতে হবে।

জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও। সম্প্রতি জেলা নাগরিক কমিটি আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় নদী-খালের সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পুনর্খনন, বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ–ব্যবস্থা ও অপরিকল্পিত ঘের নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়।

এদিকে ভুক্তভোগীদের আন্দোলনের মুখে গত মঙ্গলবার কয়েকটি ঘেরের একাংশ কেটে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এটি সাময়িক সমাধান। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, খাল ও পানি চলাচলের পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত না হলে প্রতিবছর একই দুর্ভোগ থাকবে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হবে উল্লেখ করে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ১৮ আগস্ট সাতক্ষীরায় এসে বিষয়গুলো সরেজমিনে দেখবেন। তাঁর পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত