জয়পুরহাট    বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
Daily Joypur Barta

ছেলের পাশে পরীক্ষার হলে মা, ফলাফলেও দুজন জিপিএ-৫



ছেলের পাশে পরীক্ষার হলে মা, ফলাফলেও দুজন জিপিএ-৫
ছবি: প্রতিনিধি

বিয়ের পর থেমে গিয়েছিল পড়াশোনা। সংসার, সন্তান আর পারিবারিক দায়িত্বের ব্যস্ততায় বই-খাতা থেকে দূরে ছিলেন প্রায় ১৭ বছর। কিন্তু শিক্ষার স্বপ্নটা হারিয়ে যেতে দেননি রাজশাহীর সাদিয়া বেগম। শেষ পর্যন্ত ছেলের সঙ্গে একই সময়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি অর্জন করেছেন জিপিএ-৫। 

আর ছেলে তানভীর আহমেদ পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। মা-ছেলের এমন ব্যতিক্রমী সাফল্যে এখন আনন্দে ভাসছে পরিবার ও এলাকাবাসী।

রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানার বসিলা এলাকার বাসিন্দা সাদিয়া বেগম। প্রায় ১৯ বছর আগে বিয়ের পর নানা পারিবারিক কারণে তার পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। দীর্ঘ বিরতির পর প্রায় দুই বছর আগে তিনি আবারও বই-খাতা হাতে তুলে নেন। তখনই সিদ্ধান্ত নেন—ছেলের সঙ্গে একই বছরে তিনিও এসএসসি পরীক্ষা দেবেন।

সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি দুই ছেলের পড়াশোনার খোঁজ রাখা, ঘরের কাজ এবং নিজের পড়াশোনা—সবকিছুর মধ্যে সময় ভাগ করে নেন সাদিয়া। কখনো সন্তানদের পড়াশোনার তদারকি করেছেন, আবার কখনো রাত জেগে নিজের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন।

চলতি বছরের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় রাজপাড়া আদর্শ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ থেকে অংশ নিয়ে সাদিয়া বেগম জিপিএ-৫ অর্জন করেন।

অন্যদিকে তার ছেলে তানভীর আহমেদ রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অর্জন করেছে গোল্ডেন জিপিএ-৫।

মায়ের স্বপ্ন থামেনি ১৭ বছরেও সাদিয়া বেগম বলেন, পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ সবসময়ই ছিল। কিন্তু বিয়ের পর সংসার ও পারিবারিক নানা দায়িত্বের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। দীর্ঘ বিরতির পরও সেই স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি তিনি।

তিনি বলেন, “বছর দুয়েক আগে সিদ্ধান্ত নিলাম, ছেলের সঙ্গে আমিও পরীক্ষা দেব। পরিবারের সম্মতিতে আবার পড়াশোনা শুরু করি। সংসার ও সন্তানদের দায়িত্ব সামলে নিজের পড়াশোনার জন্যও সময় বের করেছি।”

নিজের ফলাফলের পাশাপাশি ছেলের গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়াকে নিজের জন্য আরও বড় আনন্দের বলে জানান তিনি।

‘মায়ের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার সৌভাগ্য কজনের হয়?’মায়ের সঙ্গে একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তানভীর আহমেদের কাছেও ছিল ব্যতিক্রমী।

তানভীর বলেন, “আমি সবচেয়ে সৌভাগ্যবান যে, এবার আমার মায়ের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনই জিপিএ-৫ পেয়েছি। মায়ের সঙ্গে একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সৌভাগ্য কজনের হয়?”

তার ভাষ্য, মা যেমন তার পড়াশোনার খোঁজ রাখতেন, তেমনি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যেতেন। অনেক সময় রাতে মা তার পাশে বসেই নিজের পড়াশোনা করতেন।

নিজের এই অর্জন বাবা-মাকে উৎসর্গ করেছেন তানভীর। চার বছর ধরে কাছ থেকে দেখেছেন শিক্ষক

মা-ছেলের এই সাফল্যে খুশি তাদের গৃহশিক্ষক আরিফুল ইসলামও। তিনি জানান, প্রায় চার বছর ধরে তানভীরকে ইংরেজি পড়ানোর পাশাপাশি সাদিয়ার পড়াশোনাতেও সহযোগিতা করেছেন।

আরিফুল ইসলাম বলেন, সংসার ও সন্তানদের দায়িত্বের পাশাপাশি একজন মায়ের নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে এমন ফলাফল অর্জন সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সাদিয়ার স্বামী তোফাজ্জল হোসেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। সংসার, সন্তান লালন-পালন ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যেও সাদিয়া নিজের অসমাপ্ত শিক্ষাজীবনকে নতুন করে শুরু করেন।

ফল প্রকাশের পর সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে বসিলার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা-ছেলের সাফল্য ঘিরে স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে উৎসবের আবহ। অভিনন্দন জানাতে বাড়িতে আসছেন পরিচিতজনেরা।

১৭ বছর বই থেকে দূরে থাকা এক মা আর তার পাশে থাকা ছেলে—শেষ পর্যন্ত একই পরীক্ষার ফলাফলে দুজনের নাম উঠল সাফল্যের তালিকায়। সাদিয়া বেগমের গল্প তাই শুধু একটি ভালো ফলাফলের গল্প নয়; এটি প্রমাণ করে, স্বপ্নের পথে দেরি হতে পারে, কিন্তু স্বপ্নের বয়স হয় না।

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬


ছেলের পাশে পরীক্ষার হলে মা, ফলাফলেও দুজন জিপিএ-৫

প্রকাশের তারিখ : ১২ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বিয়ের পর থেমে গিয়েছিল পড়াশোনা। সংসার, সন্তান আর পারিবারিক দায়িত্বের ব্যস্ততায় বই-খাতা থেকে দূরে ছিলেন প্রায় ১৭ বছর। কিন্তু শিক্ষার স্বপ্নটা হারিয়ে যেতে দেননি রাজশাহীর সাদিয়া বেগম। শেষ পর্যন্ত ছেলের সঙ্গে একই সময়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি অর্জন করেছেন জিপিএ-৫। 

আর ছেলে তানভীর আহমেদ পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। মা-ছেলের এমন ব্যতিক্রমী সাফল্যে এখন আনন্দে ভাসছে পরিবার ও এলাকাবাসী।

রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানার বসিলা এলাকার বাসিন্দা সাদিয়া বেগম। প্রায় ১৯ বছর আগে বিয়ের পর নানা পারিবারিক কারণে তার পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। দীর্ঘ বিরতির পর প্রায় দুই বছর আগে তিনি আবারও বই-খাতা হাতে তুলে নেন। তখনই সিদ্ধান্ত নেন—ছেলের সঙ্গে একই বছরে তিনিও এসএসসি পরীক্ষা দেবেন।

সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি দুই ছেলের পড়াশোনার খোঁজ রাখা, ঘরের কাজ এবং নিজের পড়াশোনা—সবকিছুর মধ্যে সময় ভাগ করে নেন সাদিয়া। কখনো সন্তানদের পড়াশোনার তদারকি করেছেন, আবার কখনো রাত জেগে নিজের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন।

চলতি বছরের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় রাজপাড়া আদর্শ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ থেকে অংশ নিয়ে সাদিয়া বেগম জিপিএ-৫ অর্জন করেন।

অন্যদিকে তার ছেলে তানভীর আহমেদ রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অর্জন করেছে গোল্ডেন জিপিএ-৫।

মায়ের স্বপ্ন থামেনি ১৭ বছরেও সাদিয়া বেগম বলেন, পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ সবসময়ই ছিল। কিন্তু বিয়ের পর সংসার ও পারিবারিক নানা দায়িত্বের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। দীর্ঘ বিরতির পরও সেই স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি তিনি।

তিনি বলেন, “বছর দুয়েক আগে সিদ্ধান্ত নিলাম, ছেলের সঙ্গে আমিও পরীক্ষা দেব। পরিবারের সম্মতিতে আবার পড়াশোনা শুরু করি। সংসার ও সন্তানদের দায়িত্ব সামলে নিজের পড়াশোনার জন্যও সময় বের করেছি।”

নিজের ফলাফলের পাশাপাশি ছেলের গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়াকে নিজের জন্য আরও বড় আনন্দের বলে জানান তিনি।

‘মায়ের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার সৌভাগ্য কজনের হয়?’মায়ের সঙ্গে একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তানভীর আহমেদের কাছেও ছিল ব্যতিক্রমী।

তানভীর বলেন, “আমি সবচেয়ে সৌভাগ্যবান যে, এবার আমার মায়ের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনই জিপিএ-৫ পেয়েছি। মায়ের সঙ্গে একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সৌভাগ্য কজনের হয়?”

তার ভাষ্য, মা যেমন তার পড়াশোনার খোঁজ রাখতেন, তেমনি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যেতেন। অনেক সময় রাতে মা তার পাশে বসেই নিজের পড়াশোনা করতেন।

নিজের এই অর্জন বাবা-মাকে উৎসর্গ করেছেন তানভীর। চার বছর ধরে কাছ থেকে দেখেছেন শিক্ষক

মা-ছেলের এই সাফল্যে খুশি তাদের গৃহশিক্ষক আরিফুল ইসলামও। তিনি জানান, প্রায় চার বছর ধরে তানভীরকে ইংরেজি পড়ানোর পাশাপাশি সাদিয়ার পড়াশোনাতেও সহযোগিতা করেছেন।

আরিফুল ইসলাম বলেন, সংসার ও সন্তানদের দায়িত্বের পাশাপাশি একজন মায়ের নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে এমন ফলাফল অর্জন সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সাদিয়ার স্বামী তোফাজ্জল হোসেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। সংসার, সন্তান লালন-পালন ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যেও সাদিয়া নিজের অসমাপ্ত শিক্ষাজীবনকে নতুন করে শুরু করেন।

ফল প্রকাশের পর সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে বসিলার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা-ছেলের সাফল্য ঘিরে স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে উৎসবের আবহ। অভিনন্দন জানাতে বাড়িতে আসছেন পরিচিতজনেরা।

১৭ বছর বই থেকে দূরে থাকা এক মা আর তার পাশে থাকা ছেলে—শেষ পর্যন্ত একই পরীক্ষার ফলাফলে দুজনের নাম উঠল সাফল্যের তালিকায়। সাদিয়া বেগমের গল্প তাই শুধু একটি ভালো ফলাফলের গল্প নয়; এটি প্রমাণ করে, স্বপ্নের পথে দেরি হতে পারে, কিন্তু স্বপ্নের বয়স হয় না।


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত