জয়পুরহাট    বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
Daily Joypur Barta

সড়ক নির্মাণে এলজিইডির ‘কৌশলী ফাঁকি’

নকশায় পুরো রাস্তা, বাস্তবে বাদ ৫০ মিটার!



নকশায় পুরো রাস্তা, বাস্তবে বাদ ৫০ মিটার!
নকশায় পুরো রাস্তা থাকলেও বাস্তবে শেষপ্রান্তের ৫০ মিটার বাদ রাখা হয়েছে। ওই অংশ বাদ রেখে কাজ করলে জনভোগান্তি থেকেই যাবে। ছবি: জয়পুরবার্তা

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রায় ৫৯ লাখ ৩৯ হাজার ৫৫৮ টাকা ব্যয়ের একটি পাকা সড়ক নির্মাণে চরম অনিয়ম, ভৌগোলিক জালিয়াতি ও চতুরতার অভিযোগ উঠেছে। নওগাঁ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সম্পূর্ণ রাস্তার মাপ ও নকশা চূড়ান্ত করা সত্ত্বেও কাজের সময় রহস্যজনকভাবে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে প্রায় ৫০ মিটার অংশ।

একই সাথে যে গ্রামের ওপর দিয়ে রাস্তাটি নির্মিত হচ্ছে, সেই ‘উজালপুর’ গ্রামের নাম মুছে দিয়ে নথিপত্রে ‘জগপাড়া’ নামে প্রকল্প গেজেটভুক্ত করার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

এলজিইডি উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বদলগাছী উপজেলার ‘মিঠাপুর পুরাতন হাটখোলা থেকে জগপাড়া পাকা রাস্তা’ নামে একটি কাজ ধরা হয়েছে। এই কাজটি নওগাঁ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় করা হচ্ছে। প্রায় ৩ মিটার চওড়া ও ৫৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের সড়কটি প্রায় ৫৯ লাখ ৩৯ হাজার ৫৫৮ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে নির্মাণের কাজ চলছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পুরো রাস্তাটি সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত করা হয়।

নকশায় পুরো রাস্তা, বাস্তবে সুকৌশলে ৫০ মিটার বাদ!

মিঠাপুর পুরাতন হাটখোলা থেকে সড়কটির শেষ সীমানা উজালপুর গ্রাম ইউনিব্লক রাস্তা পর্যন্ত মেপে নকশা প্রণয়ন করেছিল এলজিইডি। কিন্তু দৃশ্যমান নির্মাণকাজ শুরু হতেই দেখা যায়, এলজিইডি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মিলে মাত্র ৫৫০ মিটার অংশে কাজ করছে এবং মূল সড়কের শেষপ্রান্তের প্রায় ৫০ মিটার অংশ পুরোপুরি বাদ রেখে কাঁচা অবস্থায় ফেলে রাখছে। একই আইডি ও একই বরাদ্দের অধীনে পুরো রাস্তার নকশা থাকলেও শেষ মুহূর্তে এই কাটছাঁটে চরম ক্ষোভ স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরো রাস্তার নকশা ও বরাদ্দ এক থাকা সত্ত্বেও কাজের সময় এসে সুকৌশলে প্রায় ৫৫০ মিটার কাজ করা হলেও মাঝখান থেকে প্রায় ৫০ মিটার অংশ সম্পূর্ণ বাদ রাখা হয়েছে। একই সড়ক এবং একই প্রকল্পের অধীনে হওয়া সত্ত্বেও এই অল্প অংশটুকু কেন বাদ দেওয়া হলো? এই অংশ বাদ দেওয়ায় সরকারের অর্জিত সুফল শূন্যে নামবে।

এলাকার সচেতন মহলের মতে, পরিকল্পিতভাবেই এই অল্প অংশটুকু বাদ রাখা হয়েছে। কারণ, পরবর্তীতে এই ৫০ মিটারের জন্য নতুন কোনো প্রকল্প দেখিয়ে পুনরায় সরকারি মোটা অংকের বাজেট বাগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। একই রাস্তায় বারবার বরাদ্দ এনে একদিকে যেমন সরকারের লাখ লাখ টাকার অপচয় ঘটবে, অন্যদিকে জনগণ দীর্ঘমেয়াদী দুর্ভোগে আটকে থাকবে।

গ্রামের বাসিন্দা প্রণব মন্ডল বলেন, ৫০-৬০ মিটার অংশ বাদ দেওয়াতে চলাচলে অনেক অসুবিধা হবে। এই অংশ কাঁচা রাস্তায় থেকে যাবে। সামান্য বৃষ্টিতেই অবশিষ্ট কাঁচা অংশে কাঁদা ও পানি জমে যানবাহন ও লোকজন চলাচলে দুর্ভোগ থেকেই যাবে।

উজালপুর হয়ে গেল ‘জগপাড়া’!

শুধু দৈর্ঘ্যে কারচুপিই নয়, সরকারি নথিপত্র ও গেজেটেও ঘটেছে চরম গাফিলতি ও ভৌগোলিক জালিয়াতি। প্রকল্পের নথিতে নাম দেওয়া হয়েছে- ‘মিঠাপুর পুরাতন হাটখোলা থেকে জগপাড়া পাকা রাস্তা’। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কটি যে গ্রামে শেষ হয়েছে এবং যে গ্রামের শত শত মানুষ প্রতিদিন এটি ব্যবহার করেন, তার প্রকৃত নাম ‘উজালপুর’।

উক্ত স্থানে ‘জগপাড়া’ নামে কোনো পাড়া বা মহল্লার বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব নেই! জগপাড়া মূলত সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি গ্রামের নাম। গ্রামবাসীদের প্রশ্ন- যেখানে গ্রামের আসল নাম উজালপুর, সেখানে ‘জগপাড়া’ নাম বসিয়ে নথিপত্রে কাদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে? প্রকল্পের সঠিক নাম হওয়া উচিত ছিল ‘মিঠাপুর পুরাতন হাটখোলা থেকে উজালপুর গ্রাম পাকা রাস্তা’। নথিতে বিভ্রান্তিকর ভুল নাম থাকায় ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক বিভ্রান্তির বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এলজিইডির মাঠপর্যায়ের তদারকির অভাব, নতুন প্রকল্পের আশা

জানা গেছে, রাজশাহীর ‘মেসার্স সবুজসাথী ট্রেডার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই কাজটির কার্যাদেশ পায়। তবে সরেজমিনে কাজের পরিমাপ ও ভৌগোলিক অসঙ্গতি চোখে পড়লেও এলজিইডির মাঠপর্যায়ের তদারকি রহস্যজনকভাবে শিথিল।

ঠিকাদার জিল্লুর রহমান মারুফ বলেন, এস্টিমেটে আছে ৫৫০ মিটার। ওই রাস্তায় সামান্য অংশ বাদ আছে, এটা আমি জানি। সেটা টেন্ডার প্রক্রিয়াতেও আসেনি। এটা কেন বাদ পড়েছে, সেটি আমি বলতে পারছি না। আবার সেখানে একজন ব্যক্তি দাবি করেছেন তার জায়গায় উপর দিয়ে রাস্তার কাজ হচ্ছে, এটা নিয়ে অভিযোগও করেছন। সেজন্য রাস্তার কাজ করতে দেরি হচ্ছে।

বদলগাছী উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী মো: শাহারিয়ার বলেন, পরবর্তীতে সংশোধনের জন্য কোন চিঠি আসেলে অন্য কোন প্রকল্প থেকে ওই অংশের কাজ করা যাবে। ওই অংশ বাদ রেখে কেন মাপা হয়েছিল, তা আমার জানা নেই। গ্রামের নামের বিষয়ে তিনি বলেন, আসলে ওই গ্রামের নাম কি সেটা আমাকে কাগজ দেখে বলতে হবে।

বিষয়টি দেখতে হবে বলে জানিয়েছেন নওগাঁ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো: মুনসুর আলী।

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬


নকশায় পুরো রাস্তা, বাস্তবে বাদ ৫০ মিটার!

প্রকাশের তারিখ : ০৩ আগস্ট ২০২৬

featured Image

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রায় ৫৯ লাখ ৩৯ হাজার ৫৫৮ টাকা ব্যয়ের একটি পাকা সড়ক নির্মাণে চরম অনিয়ম, ভৌগোলিক জালিয়াতি ও চতুরতার অভিযোগ উঠেছে। নওগাঁ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সম্পূর্ণ রাস্তার মাপ ও নকশা চূড়ান্ত করা সত্ত্বেও কাজের সময় রহস্যজনকভাবে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে প্রায় ৫০ মিটার অংশ।

একই সাথে যে গ্রামের ওপর দিয়ে রাস্তাটি নির্মিত হচ্ছে, সেই ‘উজালপুর’ গ্রামের নাম মুছে দিয়ে নথিপত্রে ‘জগপাড়া’ নামে প্রকল্প গেজেটভুক্ত করার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

এলজিইডি উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বদলগাছী উপজেলার ‘মিঠাপুর পুরাতন হাটখোলা থেকে জগপাড়া পাকা রাস্তা’ নামে একটি কাজ ধরা হয়েছে। এই কাজটি নওগাঁ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় করা হচ্ছে। প্রায় ৩ মিটার চওড়া ও ৫৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের সড়কটি প্রায় ৫৯ লাখ ৩৯ হাজার ৫৫৮ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে নির্মাণের কাজ চলছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পুরো রাস্তাটি সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত করা হয়।

নকশায় পুরো রাস্তা, বাস্তবে সুকৌশলে ৫০ মিটার বাদ!

মিঠাপুর পুরাতন হাটখোলা থেকে সড়কটির শেষ সীমানা উজালপুর গ্রাম ইউনিব্লক রাস্তা পর্যন্ত মেপে নকশা প্রণয়ন করেছিল এলজিইডি। কিন্তু দৃশ্যমান নির্মাণকাজ শুরু হতেই দেখা যায়, এলজিইডি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মিলে মাত্র ৫৫০ মিটার অংশে কাজ করছে এবং মূল সড়কের শেষপ্রান্তের প্রায় ৫০ মিটার অংশ পুরোপুরি বাদ রেখে কাঁচা অবস্থায় ফেলে রাখছে। একই আইডি ও একই বরাদ্দের অধীনে পুরো রাস্তার নকশা থাকলেও শেষ মুহূর্তে এই কাটছাঁটে চরম ক্ষোভ স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরো রাস্তার নকশা ও বরাদ্দ এক থাকা সত্ত্বেও কাজের সময় এসে সুকৌশলে প্রায় ৫৫০ মিটার কাজ করা হলেও মাঝখান থেকে প্রায় ৫০ মিটার অংশ সম্পূর্ণ বাদ রাখা হয়েছে। একই সড়ক এবং একই প্রকল্পের অধীনে হওয়া সত্ত্বেও এই অল্প অংশটুকু কেন বাদ দেওয়া হলো? এই অংশ বাদ দেওয়ায় সরকারের অর্জিত সুফল শূন্যে নামবে।

এলাকার সচেতন মহলের মতে, পরিকল্পিতভাবেই এই অল্প অংশটুকু বাদ রাখা হয়েছে। কারণ, পরবর্তীতে এই ৫০ মিটারের জন্য নতুন কোনো প্রকল্প দেখিয়ে পুনরায় সরকারি মোটা অংকের বাজেট বাগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। একই রাস্তায় বারবার বরাদ্দ এনে একদিকে যেমন সরকারের লাখ লাখ টাকার অপচয় ঘটবে, অন্যদিকে জনগণ দীর্ঘমেয়াদী দুর্ভোগে আটকে থাকবে।

গ্রামের বাসিন্দা প্রণব মন্ডল বলেন, ৫০-৬০ মিটার অংশ বাদ দেওয়াতে চলাচলে অনেক অসুবিধা হবে। এই অংশ কাঁচা রাস্তায় থেকে যাবে। সামান্য বৃষ্টিতেই অবশিষ্ট কাঁচা অংশে কাঁদা ও পানি জমে যানবাহন ও লোকজন চলাচলে দুর্ভোগ থেকেই যাবে।

উজালপুর হয়ে গেল ‘জগপাড়া’!

শুধু দৈর্ঘ্যে কারচুপিই নয়, সরকারি নথিপত্র ও গেজেটেও ঘটেছে চরম গাফিলতি ও ভৌগোলিক জালিয়াতি। প্রকল্পের নথিতে নাম দেওয়া হয়েছে- ‘মিঠাপুর পুরাতন হাটখোলা থেকে জগপাড়া পাকা রাস্তা’। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কটি যে গ্রামে শেষ হয়েছে এবং যে গ্রামের শত শত মানুষ প্রতিদিন এটি ব্যবহার করেন, তার প্রকৃত নাম ‘উজালপুর’।

উক্ত স্থানে ‘জগপাড়া’ নামে কোনো পাড়া বা মহল্লার বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব নেই! জগপাড়া মূলত সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি গ্রামের নাম। গ্রামবাসীদের প্রশ্ন- যেখানে গ্রামের আসল নাম উজালপুর, সেখানে ‘জগপাড়া’ নাম বসিয়ে নথিপত্রে কাদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে? প্রকল্পের সঠিক নাম হওয়া উচিত ছিল ‘মিঠাপুর পুরাতন হাটখোলা থেকে উজালপুর গ্রাম পাকা রাস্তা’। নথিতে বিভ্রান্তিকর ভুল নাম থাকায় ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক বিভ্রান্তির বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এলজিইডির মাঠপর্যায়ের তদারকির অভাব, নতুন প্রকল্পের আশা

জানা গেছে, রাজশাহীর ‘মেসার্স সবুজসাথী ট্রেডার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই কাজটির কার্যাদেশ পায়। তবে সরেজমিনে কাজের পরিমাপ ও ভৌগোলিক অসঙ্গতি চোখে পড়লেও এলজিইডির মাঠপর্যায়ের তদারকি রহস্যজনকভাবে শিথিল।

ঠিকাদার জিল্লুর রহমান মারুফ বলেন, এস্টিমেটে আছে ৫৫০ মিটার। ওই রাস্তায় সামান্য অংশ বাদ আছে, এটা আমি জানি। সেটা টেন্ডার প্রক্রিয়াতেও আসেনি। এটা কেন বাদ পড়েছে, সেটি আমি বলতে পারছি না। আবার সেখানে একজন ব্যক্তি দাবি করেছেন তার জায়গায় উপর দিয়ে রাস্তার কাজ হচ্ছে, এটা নিয়ে অভিযোগও করেছন। সেজন্য রাস্তার কাজ করতে দেরি হচ্ছে।

বদলগাছী উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী মো: শাহারিয়ার বলেন, পরবর্তীতে সংশোধনের জন্য কোন চিঠি আসেলে অন্য কোন প্রকল্প থেকে ওই অংশের কাজ করা যাবে। ওই অংশ বাদ রেখে কেন মাপা হয়েছিল, তা আমার জানা নেই। গ্রামের নামের বিষয়ে তিনি বলেন, আসলে ওই গ্রামের নাম কি সেটা আমাকে কাগজ দেখে বলতে হবে।

বিষয়টি দেখতে হবে বলে জানিয়েছেন নওগাঁ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো: মুনসুর আলী।


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত