জয়পুরহাট    বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
Daily Joypur Barta

নওগাঁয় টালমাটাল চালের বাজার! প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা



নওগাঁয় টালমাটাল চালের বাজার! প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা
ছবি: প্রতিনিধি

ধান চাল উৎপাদনে বরাবরই শীর্ষে উত্তরের জেলা নওগাঁ। এখানকার উৎপাদিত সুগন্ধি চালের বিশেষ কদর রয়েছে সারাদেশের খুচরা এবং পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে। এক মাসের ব্যবধানে চাল বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। 

কেজিতে এবার ২-৪ টাকা নয় বেড়েছে ৮০ টাকা সুগন্ধি (আতপ) চালের দাম। শুধু তাই নয়, সুগন্ধীর পাশাপাশি বেড়েছে কাটারীসহ সব ধরনের সরু চালের দামও। দেশের বৃহত্তর চালের মোকাম নওগাঁয় ঠিক এমনই টালমাটাল চালের বাজার।

ক্রেতা এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় কিছু মিল আর কর্পরেট কম্পানিগুলোর মজুদ সিন্ডিকেটের কারনেই বাড়ছে চালের দাম। তবে মিল মালিক আর ব্যবসায়ী নেতাদের দাবী, সরকারীভাবে রপ্তানী আর হাটে ধানের বাড়তি দামের কারণেই উর্ধ্বমুখী চালের দাম। পরিরিস্থি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং এর কথা বললেও বাস্তবে দেখা মিলেনি কারোই।

নওগাঁ পৌর খুচরা চাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, গেলো ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে সকল প্রকার সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত। বাজারে মোট বিক্রির ৮০ শতাংশই হয় কাটারি চাল। শর্টার ও নন শর্টারসহ সব ধরনের কাটারিরর দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা। ৭৬ টাকা কেজির চাল ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে বিক্রি হচ্ছে ৮০টাকায়। স্বর্ণা-৫ জাতের চাল ২ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫১ টাকায়। বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি। 

কয়েকদিন আগেও যার দাম ছিল ৫৮ টাকা। তবে স্মরণ কালের সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সুগন্ধি (আতপ) চাল। একমাস আগেও এই চাল বাজারে বিক্রি হচ্ছিল ১২০ টাকা কেজিতে। কিন্তু প্রতিদিনই বৃদ্ধি পেতে পেতে এখন সেই চাল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতেই বেড়েছে ৮০ টাকা। চালের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে সাধারণ ভোক্তাদের মাঝে। বাজারে চাল কিনতে এসে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

আতপ চাল কিনতে আসা ইসমাইল হোসেন বলেন, গ্রামের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ১৩ কেজি আতপ চাল কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু বাজারে এসে শুনি সেই চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। এভাবে হঠাৎ করেই দাম বেড়ে যাওয়াই চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

আব্দুর রহিম নামে আরেক ক্রেতা ৫ কেজি ভাতের চাল কিনতে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎই দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন। বলেন, এভাবে দাম বাড়লে যারা দিন এনে দিন খান তাদের জন্য চাল কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

নওগাঁ পৌর ক্ষুদ্র চাল বাজারের ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, ৪০ বছর ধরে চালের ব্যবসা করে আসছি। আমার ব্যবসার জীবনে এতটা দাম বৃদ্ধি কখনও দেখিনি। বিশেষ করে আতপ চালের দাম এতটা বৃদ্ধির পিছনে যৌক্তিক কোন কারণ আছে বলে মনে হয়না। প্রতিদিনই ক্রেতাদের কাছ থেকে বাঁকা কথা শুনতে হচ্ছে আমাদের।

আরেক ব্যবসায়ী আনোয়ার অভিযোগ করে বলেন, কিছু বড় মিলার ও কর্পরেট ব্যবসায়ী মৌসুমের শুরুতেই চাল কিনে মজুদ করেছেন। তারাই মূলত এখন বাজার নিয়ন্ত্রন করছেন।

ফারিহা ও শেখ রাইস মিলের মালিক শেখ ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘চালের ব্যবসা ধীরে ধীরে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। তারা যেভাবে দাম নির্ধারণ করছে, তার প্রভাব পুরো বাজারে পড়ছে। এতে ছোট ও মাঝারি মিল মালিকরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। বাজারে অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

মফিক উদ্দিন অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক তৌফিকুল ইসলাম জানান, সরকার কয়েক মাস ধরেই আতপ চাল রপ্তানীর অনুমতি দিয়ে রেখেছেন। দেশ থেকে এবার বড় পরিসরে আতপ রপ্তানী হচ্ছে। যার কারণেই আতপের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। 

আর আতপের যোগান কমে যাওয়ায় চাপ বেড়েছে অন্যান্য সরু চালে। মানুষ আতপের চাহিদার অনেকটাই কাটারিসহ অন্যান্য সরু চাল দিয়ে মিটাচ্ছেন। যার কারনেই সরু ও আতপের দাম কিছুটা বেশি।

নওগাঁ চাউলকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘চিনিগুড়া একটি বিশেষায়িত সুগন্ধি চাল। এর উৎপাদন সীমিত হলেও চাহিদা অনেক বেশি। 

তবে সাম্প্রতিক সময়ে যে হারে দাম বেড়েছে, তা স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাজারে কারা মূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। এছাড়া ধান বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলেই চালের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বর্তমানে হাটগুলোতে প্রতি মন কাটারি ১৮০০ আর আতপ কিনতে হচ্ছে ৩ হাজার ৭’শ টাকায়।

নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ফরহাদ খন্দকার বলেন, মূলত রপ্তানীর কারনেই দাম বেড়েছে কিছুটা। নওগাঁয় অটোমেটিক ও হাসকিং মিলিয়ে সাড়ে ৪’শ রাইস মিল রয়েছে। খাদ্য বিভাগ প্রতিনিয়তই মিলগুলোতে নজর রাখছে। অবৈধ মজুদ অনুসন্ধানে মাঠে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬


নওগাঁয় টালমাটাল চালের বাজার! প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ধান চাল উৎপাদনে বরাবরই শীর্ষে উত্তরের জেলা নওগাঁ। এখানকার উৎপাদিত সুগন্ধি চালের বিশেষ কদর রয়েছে সারাদেশের খুচরা এবং পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে। এক মাসের ব্যবধানে চাল বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। 

কেজিতে এবার ২-৪ টাকা নয় বেড়েছে ৮০ টাকা সুগন্ধি (আতপ) চালের দাম। শুধু তাই নয়, সুগন্ধীর পাশাপাশি বেড়েছে কাটারীসহ সব ধরনের সরু চালের দামও। দেশের বৃহত্তর চালের মোকাম নওগাঁয় ঠিক এমনই টালমাটাল চালের বাজার।

ক্রেতা এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় কিছু মিল আর কর্পরেট কম্পানিগুলোর মজুদ সিন্ডিকেটের কারনেই বাড়ছে চালের দাম। তবে মিল মালিক আর ব্যবসায়ী নেতাদের দাবী, সরকারীভাবে রপ্তানী আর হাটে ধানের বাড়তি দামের কারণেই উর্ধ্বমুখী চালের দাম। পরিরিস্থি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং এর কথা বললেও বাস্তবে দেখা মিলেনি কারোই।

নওগাঁ পৌর খুচরা চাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, গেলো ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে সকল প্রকার সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত। বাজারে মোট বিক্রির ৮০ শতাংশই হয় কাটারি চাল। শর্টার ও নন শর্টারসহ সব ধরনের কাটারিরর দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা। ৭৬ টাকা কেজির চাল ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে বিক্রি হচ্ছে ৮০টাকায়। স্বর্ণা-৫ জাতের চাল ২ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫১ টাকায়। বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি। 

কয়েকদিন আগেও যার দাম ছিল ৫৮ টাকা। তবে স্মরণ কালের সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সুগন্ধি (আতপ) চাল। একমাস আগেও এই চাল বাজারে বিক্রি হচ্ছিল ১২০ টাকা কেজিতে। কিন্তু প্রতিদিনই বৃদ্ধি পেতে পেতে এখন সেই চাল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতেই বেড়েছে ৮০ টাকা। চালের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে সাধারণ ভোক্তাদের মাঝে। বাজারে চাল কিনতে এসে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

আতপ চাল কিনতে আসা ইসমাইল হোসেন বলেন, গ্রামের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ১৩ কেজি আতপ চাল কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু বাজারে এসে শুনি সেই চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। এভাবে হঠাৎ করেই দাম বেড়ে যাওয়াই চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

আব্দুর রহিম নামে আরেক ক্রেতা ৫ কেজি ভাতের চাল কিনতে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎই দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন। বলেন, এভাবে দাম বাড়লে যারা দিন এনে দিন খান তাদের জন্য চাল কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

নওগাঁ পৌর ক্ষুদ্র চাল বাজারের ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, ৪০ বছর ধরে চালের ব্যবসা করে আসছি। আমার ব্যবসার জীবনে এতটা দাম বৃদ্ধি কখনও দেখিনি। বিশেষ করে আতপ চালের দাম এতটা বৃদ্ধির পিছনে যৌক্তিক কোন কারণ আছে বলে মনে হয়না। প্রতিদিনই ক্রেতাদের কাছ থেকে বাঁকা কথা শুনতে হচ্ছে আমাদের।

আরেক ব্যবসায়ী আনোয়ার অভিযোগ করে বলেন, কিছু বড় মিলার ও কর্পরেট ব্যবসায়ী মৌসুমের শুরুতেই চাল কিনে মজুদ করেছেন। তারাই মূলত এখন বাজার নিয়ন্ত্রন করছেন।

ফারিহা ও শেখ রাইস মিলের মালিক শেখ ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘চালের ব্যবসা ধীরে ধীরে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। তারা যেভাবে দাম নির্ধারণ করছে, তার প্রভাব পুরো বাজারে পড়ছে। এতে ছোট ও মাঝারি মিল মালিকরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। বাজারে অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

মফিক উদ্দিন অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক তৌফিকুল ইসলাম জানান, সরকার কয়েক মাস ধরেই আতপ চাল রপ্তানীর অনুমতি দিয়ে রেখেছেন। দেশ থেকে এবার বড় পরিসরে আতপ রপ্তানী হচ্ছে। যার কারণেই আতপের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। 

আর আতপের যোগান কমে যাওয়ায় চাপ বেড়েছে অন্যান্য সরু চালে। মানুষ আতপের চাহিদার অনেকটাই কাটারিসহ অন্যান্য সরু চাল দিয়ে মিটাচ্ছেন। যার কারনেই সরু ও আতপের দাম কিছুটা বেশি।

নওগাঁ চাউলকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘চিনিগুড়া একটি বিশেষায়িত সুগন্ধি চাল। এর উৎপাদন সীমিত হলেও চাহিদা অনেক বেশি। 

তবে সাম্প্রতিক সময়ে যে হারে দাম বেড়েছে, তা স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাজারে কারা মূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। এছাড়া ধান বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলেই চালের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বর্তমানে হাটগুলোতে প্রতি মন কাটারি ১৮০০ আর আতপ কিনতে হচ্ছে ৩ হাজার ৭’শ টাকায়।

নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ফরহাদ খন্দকার বলেন, মূলত রপ্তানীর কারনেই দাম বেড়েছে কিছুটা। নওগাঁয় অটোমেটিক ও হাসকিং মিলিয়ে সাড়ে ৪’শ রাইস মিল রয়েছে। খাদ্য বিভাগ প্রতিনিয়তই মিলগুলোতে নজর রাখছে। অবৈধ মজুদ অনুসন্ধানে মাঠে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত