জয়পুরহাট    শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬
Daily Joypur Barta

শীত মৌসুমে গ্রামাঞ্চলের নারীরা কুমড়ো বড়ি বানিয়ে স্বাবলম্বী



শীত মৌসুমে গ্রামাঞ্চলের নারীরা কুমড়ো বড়ি বানিয়ে স্বাবলম্বী
ছবি- দৈনিক জয়পুরবার্তা

বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার গ্রামাঞ্চলের নারীরা শীত মৌসুম খাবারে বাড়তি স্বাদ আনতে কুমড়ো বড়ি তৈরি করতে ব্যস্ততা দেখা যায়। কুমড়ো বড়ি তৈরির উপযুক্ত সময় শীতকাল, গ্রামের নারীদের কর্মব্যস্ততা বেড়ে যায়।  নারীরা নিত্যদিনে সংসারের কাজের ফাঁকে সকালে কুমড়াে বড়ি তৈরি করেন । কুমড়াে বড়ি তরকারির একটি মুখরোচক খাদ্য। এতে তরকারির স্বাদে যোগ হয় নতুন মাত্রা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়া কইল গ্রাম নারীরা কুমড়ো বড়ি তৈরির কাজে জড়িত। শীতের আগমনের সাথে সাথে কুমড়ো বড়ি তৈরির ব্যস্ততা বেড়েছে তাদের। বর্ষাকাল বাদে বাকি মাসগুলোতে কমবেশি কুমড়ো বড়ি তৈরি করা হয়। অগ্রহায়ণ মাস থেকে ফাল্গুন এই ৪ মাস কুমড়ো বড়ি তৈরির ধুম পড়ে যায়।

শীতকাল কুমড়ো বড়ি তৈরির ভরা মৌসুম। এ সময় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে কমবেশি কুমড়ো বড়ি তৈরি করা হয়। কেউ কেউ পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাকিটা বাজারে বিক্রি করেন। শীতে কুমড়ো বড়ির চাহিদা থাকে বেশি। আর গ্রামাঞ্চলের নারীরা বাড়তি আয়ের জন্যও কুমড়ো বড়ি তৈরি করেন।

কুমড়ো বড়ি তৈরির প্রধান উপকরণ মাসকলাইয়ের ডাল,কালোজিরা,চালের গুঁড়ো আর চালকুমড়ো। বাজারে প্রতি কেজি মাসকলাই কাঁচা খোসা সহ ১৪০ টাকা আর খোসা ছাড়া মাশকালাই  ১৬০ টাকা, চাল কুমড়ো ১৮০ থেকে ২৩০ টাকা পার পিস বিক্রি হচ্ছে। সাইজ হিসেবে চালকুমড়া ৭০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে কেনা যায়। ৫ কেজি চালকুমড়োর সঙ্গে ১০০গ্রাম কালাই জিরা, ২ কেজি মাসকলাইয়ের মিশ্রণে কুমড়ো বড়ি তৈরি হয়।

প্রথমে মাসকলাই রোদে শুকিয়ে যাতায় ভেঙে পরিষ্কার করে বা না ভেঙে পানিতে ভিজিয়ে রেখে খোসা ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। প্রায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা মাসকলাই পানিতে ভেজাতে হয়। তারপর ঢেঁকি বা শিল-পাটায় পিষে নিয়ে কুমড়ো বড়ির মিশ্রণ তৈরি করা হয়।

তবে, এখন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কুমড়ো বড়ি তৈরির জন্য চাউল গুরো করার মেশিনে মাড়াই করে মাসকলাই ও কুমড়ো মিহি করা হচ্ছে। এরপর দুইটির মিশ্রণে কুমড়ো বড়ির উপকরণ তৈরি করা হয়।

রৌদ্রোজ্জ্বল ফাঁকা স্থান, বাড়ির আঙ্গিনা, ছাদ বা খোলা জায়গায় ভোর থেকে বড়ি তৈরি করা শুরু হয়। পাতলা কাপড়ে সারি সারি বড়ি বসানো হয়। কুমড়ো বড়ি বসানোর পর দুই-তিন দিন একটানা রৌদ্রে শুকানো হয়। সূর্যের আলো কম হলে ৩-৪ দিন পর্যন্ত শুকাতে সময় লেগে যায়। শুকানোর পর কাপড় থেকে বড়ি উঠিয়ে পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। গ্রামের পিছিয়ে পড়া অনেক মেয়েরা নিজেদের ভাগ্যেন্নয়নে শ্রম দিয়ে অনেক বছর ধরে এ কুমড়ো বড়ি তৈরি করছেন। দুপচাঁচিয়া পৌর এলাকার কালিতলা, লক্ষীতলা, তালোড়া শাবলা, ঠাকুরপাড়া কইলগ্রাম,জিয়ানগর ইউনিয়নের বাঁকপাল হিন্দুপাড়া সহ ৩০-৪০টি পরিবার ব্যবসায়ীক ভিত্তিতে কুমড়ো বড়ি তৈরি করছেন।

লক্ষীতলা মহল্লার নারী কারিগর ভারতী রানি বলেন, আগে কুমড়ো বড়ি ব্যবসায়ী পরিবারগুলো প্রথম অবস্থায় তেমন স্বচ্ছল ছিল না। এখন অনেকেই কুমড়ো বড়ির ব্যবসা করেই স্বাবলম্বী হয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, ৫ কেজি কুমড়ার সঙ্গে দুই কেজি মাসকলাইয়ের কুমড়ো বড়ি ভালো তৈরি হয়। আগে মাসকলাই পানিতে ভিজিয়ে পরিষ্কার করা, আর ঢেঁকিতে বা পাটায় বেটে বড়ি তৈরি করতে প্রচুর পরিশ্রম হতো, সেই সঙ্গে অনেক সময় লাগতো। এখন খোসা ছাড়ানো মাসকলাই বাজারে কিনতে পাওয়া যায়।

মাসকলাই পানিতে ভিজিয়ে মেশিনের সাহায্যে মাড়াই করে অল্প সময়ে বড়ি তৈরির মিশ্রণ তৈরি করা খুব সহজ হয়েছে। এতে করে অল্প সময় প্রচুর পরিমাণ কুমড়ো বড়ি তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এক কেজি কুমড়ো বড়ি তৈরি করতে প্রায় ২৮০ টাকা মতো খরচ হচ্ছে। আর ভালো মানের বড়ি তৈরি করতে খরচ পড়ে ৩৫০থেকে ৪০০টাকা,আর বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা দরে। এতে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি আয় করা সম্ভব হচ্ছে।

পৌর এলাকার কুমড়ো বড়ি ব্যবসায়ী শ্যামসুন্দর মোহন্ত,অসীম বসাক, বলেন, এখানকার কুমড়ো বড়ি খুব সুস্বাদু হওয়ায় এ অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। বিশেষ করে ঢাকায় এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

তিনি আরো জানান, এটি সারা বছরজুড়ে তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু শীতকালে এর কদর বেশি হয়। কারণ, শীতের সময় রান্না করে খেতে বেশ মজা লাগে। কৈ মাছ, শিং মাছ ও শৈল মাছের সাথে রান্না করলে তরকারি খেতে মজাই আলাদা। তাদের কুমড়ো বড়ি বানানো থেকে শুরু করে সব কাজ বাড়ির মেয়ে বা নারী শ্রমিকরা করে থাকেন। কুমড়ো বড়ি তৈরি করতে নারী শ্রমিকদের মজুরিও কম।

এ বিষয়ে জীবননগর উপজেলা কৃষিকর্মকর্তা সাইফুল আবেদীন জানান, শীত মৌসুমে গ্রামের নারীরা কুমড়ো বড়ি তৈরি করে বাড়তি আয় করছেন। গ্রামীণ নারীরা উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও পৃষ্টপোষকতা পেলে তারা নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

বিষয় : কুমড়ো বড়ি

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬


শীত মৌসুমে গ্রামাঞ্চলের নারীরা কুমড়ো বড়ি বানিয়ে স্বাবলম্বী

প্রকাশের তারিখ : ২৩ নভেম্বর ২০২৫

featured Image

বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার গ্রামাঞ্চলের নারীরা শীত মৌসুম খাবারে বাড়তি স্বাদ আনতে কুমড়ো বড়ি তৈরি করতে ব্যস্ততা দেখা যায়। কুমড়ো বড়ি তৈরির উপযুক্ত সময় শীতকাল, গ্রামের নারীদের কর্মব্যস্ততা বেড়ে যায়।  নারীরা নিত্যদিনে সংসারের কাজের ফাঁকে সকালে কুমড়াে বড়ি তৈরি করেন । কুমড়াে বড়ি তরকারির একটি মুখরোচক খাদ্য। এতে তরকারির স্বাদে যোগ হয় নতুন মাত্রা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়া কইল গ্রাম নারীরা কুমড়ো বড়ি তৈরির কাজে জড়িত। শীতের আগমনের সাথে সাথে কুমড়ো বড়ি তৈরির ব্যস্ততা বেড়েছে তাদের। বর্ষাকাল বাদে বাকি মাসগুলোতে কমবেশি কুমড়ো বড়ি তৈরি করা হয়। অগ্রহায়ণ মাস থেকে ফাল্গুন এই ৪ মাস কুমড়ো বড়ি তৈরির ধুম পড়ে যায়।

শীতকাল কুমড়ো বড়ি তৈরির ভরা মৌসুম। এ সময় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে কমবেশি কুমড়ো বড়ি তৈরি করা হয়। কেউ কেউ পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাকিটা বাজারে বিক্রি করেন। শীতে কুমড়ো বড়ির চাহিদা থাকে বেশি। আর গ্রামাঞ্চলের নারীরা বাড়তি আয়ের জন্যও কুমড়ো বড়ি তৈরি করেন।

কুমড়ো বড়ি তৈরির প্রধান উপকরণ মাসকলাইয়ের ডাল,কালোজিরা,চালের গুঁড়ো আর চালকুমড়ো। বাজারে প্রতি কেজি মাসকলাই কাঁচা খোসা সহ ১৪০ টাকা আর খোসা ছাড়া মাশকালাই  ১৬০ টাকা, চাল কুমড়ো ১৮০ থেকে ২৩০ টাকা পার পিস বিক্রি হচ্ছে। সাইজ হিসেবে চালকুমড়া ৭০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে কেনা যায়। ৫ কেজি চালকুমড়োর সঙ্গে ১০০গ্রাম কালাই জিরা, ২ কেজি মাসকলাইয়ের মিশ্রণে কুমড়ো বড়ি তৈরি হয়।

প্রথমে মাসকলাই রোদে শুকিয়ে যাতায় ভেঙে পরিষ্কার করে বা না ভেঙে পানিতে ভিজিয়ে রেখে খোসা ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। প্রায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা মাসকলাই পানিতে ভেজাতে হয়। তারপর ঢেঁকি বা শিল-পাটায় পিষে নিয়ে কুমড়ো বড়ির মিশ্রণ তৈরি করা হয়।

তবে, এখন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কুমড়ো বড়ি তৈরির জন্য চাউল গুরো করার মেশিনে মাড়াই করে মাসকলাই ও কুমড়ো মিহি করা হচ্ছে। এরপর দুইটির মিশ্রণে কুমড়ো বড়ির উপকরণ তৈরি করা হয়।

রৌদ্রোজ্জ্বল ফাঁকা স্থান, বাড়ির আঙ্গিনা, ছাদ বা খোলা জায়গায় ভোর থেকে বড়ি তৈরি করা শুরু হয়। পাতলা কাপড়ে সারি সারি বড়ি বসানো হয়। কুমড়ো বড়ি বসানোর পর দুই-তিন দিন একটানা রৌদ্রে শুকানো হয়। সূর্যের আলো কম হলে ৩-৪ দিন পর্যন্ত শুকাতে সময় লেগে যায়। শুকানোর পর কাপড় থেকে বড়ি উঠিয়ে পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। গ্রামের পিছিয়ে পড়া অনেক মেয়েরা নিজেদের ভাগ্যেন্নয়নে শ্রম দিয়ে অনেক বছর ধরে এ কুমড়ো বড়ি তৈরি করছেন। দুপচাঁচিয়া পৌর এলাকার কালিতলা, লক্ষীতলা, তালোড়া শাবলা, ঠাকুরপাড়া কইলগ্রাম,জিয়ানগর ইউনিয়নের বাঁকপাল হিন্দুপাড়া সহ ৩০-৪০টি পরিবার ব্যবসায়ীক ভিত্তিতে কুমড়ো বড়ি তৈরি করছেন।

লক্ষীতলা মহল্লার নারী কারিগর ভারতী রানি বলেন, আগে কুমড়ো বড়ি ব্যবসায়ী পরিবারগুলো প্রথম অবস্থায় তেমন স্বচ্ছল ছিল না। এখন অনেকেই কুমড়ো বড়ির ব্যবসা করেই স্বাবলম্বী হয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, ৫ কেজি কুমড়ার সঙ্গে দুই কেজি মাসকলাইয়ের কুমড়ো বড়ি ভালো তৈরি হয়। আগে মাসকলাই পানিতে ভিজিয়ে পরিষ্কার করা, আর ঢেঁকিতে বা পাটায় বেটে বড়ি তৈরি করতে প্রচুর পরিশ্রম হতো, সেই সঙ্গে অনেক সময় লাগতো। এখন খোসা ছাড়ানো মাসকলাই বাজারে কিনতে পাওয়া যায়।

মাসকলাই পানিতে ভিজিয়ে মেশিনের সাহায্যে মাড়াই করে অল্প সময়ে বড়ি তৈরির মিশ্রণ তৈরি করা খুব সহজ হয়েছে। এতে করে অল্প সময় প্রচুর পরিমাণ কুমড়ো বড়ি তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এক কেজি কুমড়ো বড়ি তৈরি করতে প্রায় ২৮০ টাকা মতো খরচ হচ্ছে। আর ভালো মানের বড়ি তৈরি করতে খরচ পড়ে ৩৫০থেকে ৪০০টাকা,আর বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা দরে। এতে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি আয় করা সম্ভব হচ্ছে।

পৌর এলাকার কুমড়ো বড়ি ব্যবসায়ী শ্যামসুন্দর মোহন্ত,অসীম বসাক, বলেন, এখানকার কুমড়ো বড়ি খুব সুস্বাদু হওয়ায় এ অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। বিশেষ করে ঢাকায় এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

তিনি আরো জানান, এটি সারা বছরজুড়ে তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু শীতকালে এর কদর বেশি হয়। কারণ, শীতের সময় রান্না করে খেতে বেশ মজা লাগে। কৈ মাছ, শিং মাছ ও শৈল মাছের সাথে রান্না করলে তরকারি খেতে মজাই আলাদা। তাদের কুমড়ো বড়ি বানানো থেকে শুরু করে সব কাজ বাড়ির মেয়ে বা নারী শ্রমিকরা করে থাকেন। কুমড়ো বড়ি তৈরি করতে নারী শ্রমিকদের মজুরিও কম।

এ বিষয়ে জীবননগর উপজেলা কৃষিকর্মকর্তা সাইফুল আবেদীন জানান, শীত মৌসুমে গ্রামের নারীরা কুমড়ো বড়ি তৈরি করে বাড়তি আয় করছেন। গ্রামীণ নারীরা উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও পৃষ্টপোষকতা পেলে তারা নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত