ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সাবেক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, লিবিয়ায় তাদের মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখানে নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে দেশে স্বজনদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়।
আবদুল জব্বার রায়পুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং এলেঙ্গী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য। মেহেরপুর আদালতে দায়ের করা দুটি মামলার নথি, বাদী ও ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্যে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, এলেঙ্গী গ্রামের সামসুল আলমকে ১৪ লাখ টাকায় ইতালি পাঠানোর কথা বলা হয়। তাকে ভারত, শ্রীলঙ্কা, দুবাই, সুদান ও মিসর হয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে জানালাবিহীন কক্ষে আটকে রেখে ২০২৪ সালের আগস্টে তাকে একটি মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সামসুলের স্ত্রী পারভীনা খাতুনের অভিযোগ, স্বামীকে পায়ে দড়ি বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে নির্যাতনের এবং অঙ্গ কেটে ফেলার দৃশ্য দেখিয়ে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। তার দাবি, জব্বার ও তার স্ত্রী লিপা খাতুনের নির্দেশে ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে ৪৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। স্বামীকে ছাড়াতে তাকে ভিটেমাটি বিক্রি করতে হয়েছে।
পারভীনা জানান, ২০২৫ সালের মে মাসে সামসুল পালিয়ে ইতালি পৌঁছান। এর পর প্রায় এক বছর তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। সর্বশেষ তিনি জেনেছেন, সামসুল রোমের একটি কারাগারে আটক আছেন।
সালদহ গ্রামের শিক্ষিত বেকার যুবক মামুনুর রশীদকে ১৩ লাখ টাকায় ইতালি পাঠানোর কথা বলে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। তার অভিযোগ, সেখানে তাকে একটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করা হয়। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করার দৃশ্য দেখিয়ে তার পরিবারসহ আরও দুটি পরিবারের কাছে মোট ৯০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। পরে তিনি পালিয়ে মরুভূমি পেরিয়ে একটি মসজিদে আশ্রয় নেন এবং আরও ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ করে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরেন।
মামুন ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. শামীমের অভিযোগ, তুহিন ও বাদশাসহ আরও কয়েকজন এই চক্রের শিকার হয়েছেন। শামীম বলেন, এলাকায় একটি দালালচক্র গড়ে উঠেছে। সামসুলসহ আশপাশের ৭-৮ জনকে লিবিয়ায় আটকে রেখে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য রয়েছে। তিনি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
জব্বারের ছোট ভাই আকুব্বার ও স্ত্রী লিপা খাতুন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, জব্বার মানবপাচারে জড়িত নন, তিনি কেবল সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার পথ দেখিয়েছেন। লিপা খাতুন বলেন, তিনি কারও টাকা নেননি এবং তার ব্যাংক বা বিকাশ হিসাবেও কোনো টাকা জমা হয়নি। তার দাবি, পুলিশের তদন্তেও তা প্রমাণিত হয়েছে। মন্তব্যের জন্য টানা দুই সপ্তাহ ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে যোগাযোগের চেষ্টা করেও আবদুল জব্বারকে পাওয়া যায়নি।
বাদী মামুনুর রশীদ ও পারভীনা খাতুনের অভিযোগ, এজাহার ও ব্যাংক স্টেটমেন্টে লিপা খাতুনের নামে টাকা জমার প্রমাণ থাকলেও তদন্ত কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে লিপা খাতুন ও জব্বারের ভাই মান্নানের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অতুল জোয়ারদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিধি মেনেই তদন্ত হয়েছে এবং কারও হিসাবে টাকা জমা হলেই তিনি আসামি হন না।
গাংনী থানার ওসি মোহাদ্দিদ মোর্শেদ বলেন, বিদেশে নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ দাবি মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনের আওতায় পড়ে। তদন্ত প্রতিবেদনে অসন্তুষ্ট হলে বাদীপক্ষ আদালতে নারাজি পিটিশন দিতে পারেন। তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬
ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সাবেক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, লিবিয়ায় তাদের মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখানে নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে দেশে স্বজনদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়।
আবদুল জব্বার রায়পুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং এলেঙ্গী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য। মেহেরপুর আদালতে দায়ের করা দুটি মামলার নথি, বাদী ও ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্যে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, এলেঙ্গী গ্রামের সামসুল আলমকে ১৪ লাখ টাকায় ইতালি পাঠানোর কথা বলা হয়। তাকে ভারত, শ্রীলঙ্কা, দুবাই, সুদান ও মিসর হয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে জানালাবিহীন কক্ষে আটকে রেখে ২০২৪ সালের আগস্টে তাকে একটি মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সামসুলের স্ত্রী পারভীনা খাতুনের অভিযোগ, স্বামীকে পায়ে দড়ি বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে নির্যাতনের এবং অঙ্গ কেটে ফেলার দৃশ্য দেখিয়ে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। তার দাবি, জব্বার ও তার স্ত্রী লিপা খাতুনের নির্দেশে ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে ৪৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। স্বামীকে ছাড়াতে তাকে ভিটেমাটি বিক্রি করতে হয়েছে।
পারভীনা জানান, ২০২৫ সালের মে মাসে সামসুল পালিয়ে ইতালি পৌঁছান। এর পর প্রায় এক বছর তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। সর্বশেষ তিনি জেনেছেন, সামসুল রোমের একটি কারাগারে আটক আছেন।
সালদহ গ্রামের শিক্ষিত বেকার যুবক মামুনুর রশীদকে ১৩ লাখ টাকায় ইতালি পাঠানোর কথা বলে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। তার অভিযোগ, সেখানে তাকে একটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করা হয়। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করার দৃশ্য দেখিয়ে তার পরিবারসহ আরও দুটি পরিবারের কাছে মোট ৯০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। পরে তিনি পালিয়ে মরুভূমি পেরিয়ে একটি মসজিদে আশ্রয় নেন এবং আরও ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ করে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরেন।
মামুন ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. শামীমের অভিযোগ, তুহিন ও বাদশাসহ আরও কয়েকজন এই চক্রের শিকার হয়েছেন। শামীম বলেন, এলাকায় একটি দালালচক্র গড়ে উঠেছে। সামসুলসহ আশপাশের ৭-৮ জনকে লিবিয়ায় আটকে রেখে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য রয়েছে। তিনি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
জব্বারের ছোট ভাই আকুব্বার ও স্ত্রী লিপা খাতুন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, জব্বার মানবপাচারে জড়িত নন, তিনি কেবল সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার পথ দেখিয়েছেন। লিপা খাতুন বলেন, তিনি কারও টাকা নেননি এবং তার ব্যাংক বা বিকাশ হিসাবেও কোনো টাকা জমা হয়নি। তার দাবি, পুলিশের তদন্তেও তা প্রমাণিত হয়েছে। মন্তব্যের জন্য টানা দুই সপ্তাহ ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে যোগাযোগের চেষ্টা করেও আবদুল জব্বারকে পাওয়া যায়নি।
বাদী মামুনুর রশীদ ও পারভীনা খাতুনের অভিযোগ, এজাহার ও ব্যাংক স্টেটমেন্টে লিপা খাতুনের নামে টাকা জমার প্রমাণ থাকলেও তদন্ত কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে লিপা খাতুন ও জব্বারের ভাই মান্নানের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অতুল জোয়ারদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিধি মেনেই তদন্ত হয়েছে এবং কারও হিসাবে টাকা জমা হলেই তিনি আসামি হন না।
গাংনী থানার ওসি মোহাদ্দিদ মোর্শেদ বলেন, বিদেশে নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ দাবি মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনের আওতায় পড়ে। তদন্ত প্রতিবেদনে অসন্তুষ্ট হলে বাদীপক্ষ আদালতে নারাজি পিটিশন দিতে পারেন। তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

আপনার মতামত লিখুন