জয়পুরহাট    বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Daily Joypur Barta

নিয়ামতপুরে হারিয়ে যাওয়ার পথে খোঁয়াড়



নিয়ামতপুরে হারিয়ে যাওয়ার পথে খোঁয়াড়
ছবি- প্রতিনিধি

"খোঁয়াড় নেওয়ার জন্য আগে ইউনিয়ন পরিষদে লোকজনের ভীড় লেগে যেত। এক বছরের জন্য খোঁয়াড় নিতে রীতিমত 'যুদ্ধ' শুরু হয়ে যেতে। নিলামের মাধ্যমে একটি খোঁয়াড়ের জন্য ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ডাক হাঁকা হতো।  এখন ৩০ টাকাও বলে না।" আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোঃ জাহাঙ্গীর আলম খাঁন।   

উপজেলার আটটি ইউনিয়নের বেশিরভাগ ওয়ার্ডে খোঁয়াড় আর নাই বললেই চলে। সময়ের আর্বতে খোঁয়াড় এখন হারিয়ে যাওয়া তালিকায় ঠাঁই নিয়েছে। 

খোঁয়াড় হচ্ছে জমির ফসল অথবা বসতবাড়ির বাগান বিনষ্টকারী গবাদিপশু আটক রাখার গারদ বিশেষ। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় নিয়ামতপুর উপজেলার আটটি ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খোঁয়াড় ছিল। খোঁয়াড় ইজারা দিতে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মাইকিং করে নিলাম ডাক দেয়া হতো। বাংলা বছরের বৈশাখ মাস থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত ১ বছরের জন্য  খোঁয়াড় ইজারা দেওয়া হতো।

খোঁয়াড় সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গবাদিপশু খোঁয়াড়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে ঝগড়াবিবাদ, গোচারণভূমি কমে যাওয়া,খামার ব্যবস্থায় গবাদিপশু পালন, গবাদিপশু মালিকদের সচেতনতা, বিকল্প খাদ্যের ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে খোঁয়াড় বিলুপ্তির পথে। 

খোঁয়াড়ের বর্তমান হালহকিকত  জানতে সম্প্রতি উপজেলার চারটি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব, খোঁয়াড় নিলামকারী, ইউপি চেয়ারম্যান ও  ইউপি সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। 

ইউপি সচিবরা জানান, আগের মতো খোঁয়াড়ের নিলাম হয়না। লোকজন খোঁয়াড় নিতে আগ্রহী নয়। ইউনিয়ন ভেদে নয়টি ওয়ার্ডের সবগুলোতে নিলাম হয়না। কয়েক বছরের ব্যবধানে ইজারামূল্য প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। 

শ্রীমন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোঃ আমিরুল ইসলাম বলেন, খোঁয়াড় নিতে লোকজনকে ডেকেও পাওয়া না। তাছাড়াও গবাদিপশু  ফসল নষ্ট করলে খেতের  মালিকেরা আগের আগের মত খোঁয়াড়ে নিয়ে আসেনা। তাই অনেক ওয়ার্ডে খোঁয়াড়ই উঠে গেছে। একই কথা বললেন ভাবিচা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব করমতুল্ল্যাহ। 

রসুলপুর ইউপির দামপুরা এলাকায়  খোঁয়াড় নিলামকারী  মোঃ রফিক বলেন, তিনি গত নয় বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিলামে খোঁয়াড় ডেকে নিচ্ছেন। এবছর পাঁচ হাজার টাকায় খোঁয়াড় নিয়েছেন। গরু-ছাগল তেমন আসেনা। ভাদ্র- কার্তিক ও ফাল্গুন- বৈশাখ  মাসে খোঁয়াড়ে  গরু-ছাগল  আসে। তিনি জানান, খেতের ফসল খাওয়ার জন্য কেউ গরু-ছাগল খোঁয়াড়ে দিয়ে গেলে গরু-ছাগলের মালিকেরা নির্ধারিত হারে টাকা পরিশোধ করে  ছাড়িয়ে নিয়ে যান। 

বাহাদুরপুর ইউনিয়নের খড়িবাড়ী  এলাকায় খোঁয়াড় নিলামকারী মোঃ আব্দুল ওয়াহাব বলেন, আগের মত গবাদিপশু খোঁয়াড়ে তেমন আসেনা। মাঝেমধ্যে লোকজন শুধু ছাগল আর হাঁস খোঁয়াড়ে দিয়ে যায়। কোনো কোনো মাসে তাও হয়না। 

পাঁড়ইল ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম   বলেন, এখন গ্রাম এলাকাতেও আধুনিক পদ্ধতিতে খামার ব্যবস্থায় গরু পালন করা হচ্ছে। দোকানে মিলছে গরুর খাবার। ছাগল পালনকারীও বেঁধে রেখেই পালন করছেন। তাছাড়া গোচারণ ভূমি কমে যাওয়ার ফলে খোঁয়াড় প্রথা প্রায় উঠে গেছে। গত ১০ বছরের ব্যবধানে খোঁয়াড়ের ইজারামূল্য অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে তিনি জানালেন। 

তবে নিয়ামতপুর সদর ইউনিয়নে পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান  নুরুল ইসলাম  জানালেন, তাঁর ইউনিয়নের লোকজনের মধ্যে খোঁয়াড় নেওয়ার ভালো  আগ্রহ  রয়েছে। 

শ্রীমন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য (মেম্বার) প্রভাস বর্মন বলেন, বর্তমানে সবাই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে গরু-ছাগল পালন করে। এতে করে ক্ষেত খাওয়ার মত ঘটনা কমে গেছে। ফলে এ অঞ্চল থেকে খোঁয়াড় ব্যবস্থা একেবারেই উঠে যাচ্ছে।

বাহাদুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিবজাহাঙ্গীর আলম খাঁন বলেন, খোঁয়াড় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে এই প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নিয়ামতপুরে হারিয়ে যাওয়ার পথে খোঁয়াড়

প্রকাশের তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

"খোঁয়াড় নেওয়ার জন্য আগে ইউনিয়ন পরিষদে লোকজনের ভীড় লেগে যেত। এক বছরের জন্য খোঁয়াড় নিতে রীতিমত 'যুদ্ধ' শুরু হয়ে যেতে। নিলামের মাধ্যমে একটি খোঁয়াড়ের জন্য ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ডাক হাঁকা হতো।  এখন ৩০ টাকাও বলে না।" আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোঃ জাহাঙ্গীর আলম খাঁন।   

উপজেলার আটটি ইউনিয়নের বেশিরভাগ ওয়ার্ডে খোঁয়াড় আর নাই বললেই চলে। সময়ের আর্বতে খোঁয়াড় এখন হারিয়ে যাওয়া তালিকায় ঠাঁই নিয়েছে। 

খোঁয়াড় হচ্ছে জমির ফসল অথবা বসতবাড়ির বাগান বিনষ্টকারী গবাদিপশু আটক রাখার গারদ বিশেষ। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় নিয়ামতপুর উপজেলার আটটি ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খোঁয়াড় ছিল। খোঁয়াড় ইজারা দিতে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মাইকিং করে নিলাম ডাক দেয়া হতো। বাংলা বছরের বৈশাখ মাস থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত ১ বছরের জন্য  খোঁয়াড় ইজারা দেওয়া হতো।

খোঁয়াড় সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গবাদিপশু খোঁয়াড়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে ঝগড়াবিবাদ, গোচারণভূমি কমে যাওয়া,খামার ব্যবস্থায় গবাদিপশু পালন, গবাদিপশু মালিকদের সচেতনতা, বিকল্প খাদ্যের ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে খোঁয়াড় বিলুপ্তির পথে। 

খোঁয়াড়ের বর্তমান হালহকিকত  জানতে সম্প্রতি উপজেলার চারটি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব, খোঁয়াড় নিলামকারী, ইউপি চেয়ারম্যান ও  ইউপি সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। 

ইউপি সচিবরা জানান, আগের মতো খোঁয়াড়ের নিলাম হয়না। লোকজন খোঁয়াড় নিতে আগ্রহী নয়। ইউনিয়ন ভেদে নয়টি ওয়ার্ডের সবগুলোতে নিলাম হয়না। কয়েক বছরের ব্যবধানে ইজারামূল্য প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। 

শ্রীমন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোঃ আমিরুল ইসলাম বলেন, খোঁয়াড় নিতে লোকজনকে ডেকেও পাওয়া না। তাছাড়াও গবাদিপশু  ফসল নষ্ট করলে খেতের  মালিকেরা আগের আগের মত খোঁয়াড়ে নিয়ে আসেনা। তাই অনেক ওয়ার্ডে খোঁয়াড়ই উঠে গেছে। একই কথা বললেন ভাবিচা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব করমতুল্ল্যাহ। 

রসুলপুর ইউপির দামপুরা এলাকায়  খোঁয়াড় নিলামকারী  মোঃ রফিক বলেন, তিনি গত নয় বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিলামে খোঁয়াড় ডেকে নিচ্ছেন। এবছর পাঁচ হাজার টাকায় খোঁয়াড় নিয়েছেন। গরু-ছাগল তেমন আসেনা। ভাদ্র- কার্তিক ও ফাল্গুন- বৈশাখ  মাসে খোঁয়াড়ে  গরু-ছাগল  আসে। তিনি জানান, খেতের ফসল খাওয়ার জন্য কেউ গরু-ছাগল খোঁয়াড়ে দিয়ে গেলে গরু-ছাগলের মালিকেরা নির্ধারিত হারে টাকা পরিশোধ করে  ছাড়িয়ে নিয়ে যান। 

বাহাদুরপুর ইউনিয়নের খড়িবাড়ী  এলাকায় খোঁয়াড় নিলামকারী মোঃ আব্দুল ওয়াহাব বলেন, আগের মত গবাদিপশু খোঁয়াড়ে তেমন আসেনা। মাঝেমধ্যে লোকজন শুধু ছাগল আর হাঁস খোঁয়াড়ে দিয়ে যায়। কোনো কোনো মাসে তাও হয়না। 

পাঁড়ইল ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম   বলেন, এখন গ্রাম এলাকাতেও আধুনিক পদ্ধতিতে খামার ব্যবস্থায় গরু পালন করা হচ্ছে। দোকানে মিলছে গরুর খাবার। ছাগল পালনকারীও বেঁধে রেখেই পালন করছেন। তাছাড়া গোচারণ ভূমি কমে যাওয়ার ফলে খোঁয়াড় প্রথা প্রায় উঠে গেছে। গত ১০ বছরের ব্যবধানে খোঁয়াড়ের ইজারামূল্য অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে তিনি জানালেন। 

তবে নিয়ামতপুর সদর ইউনিয়নে পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান  নুরুল ইসলাম  জানালেন, তাঁর ইউনিয়নের লোকজনের মধ্যে খোঁয়াড় নেওয়ার ভালো  আগ্রহ  রয়েছে। 

শ্রীমন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য (মেম্বার) প্রভাস বর্মন বলেন, বর্তমানে সবাই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে গরু-ছাগল পালন করে। এতে করে ক্ষেত খাওয়ার মত ঘটনা কমে গেছে। ফলে এ অঞ্চল থেকে খোঁয়াড় ব্যবস্থা একেবারেই উঠে যাচ্ছে।

বাহাদুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিবজাহাঙ্গীর আলম খাঁন বলেন, খোঁয়াড় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে এই প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত