জয়পুরহাট    বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Daily Joypur Barta

দুই বছর ধরে রাজস্ব শূন্য

রামগতিতে জেলা পরিষদ মার্কেটের দোকান দখল-বেচাকেনার হিড়িক



রামগতিতে জেলা পরিষদ মার্কেটের দোকান দখল-বেচাকেনার হিড়িক
ছবি- প্রতিনিধি

লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে জেলা পরিষদের মালিকানাধীন মার্কেট দখল ও চড়া দামে বেচাকেনার অভিযোগ উঠেছে দখলদারদের বিরুদ্ধে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানার মতো ব্যাবহার, ভাড়া দেওয়া, হাতবদল ও স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে রাজস্ব ফাঁকি ও সরকারের অন্তত অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে। বর্তমানে ওই মার্কেট জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে নেই। এটি দখলবাজদের কবজায় রয়েছে।

অভিযোগ ওঠেছে , জেলা পরিষদের নীতিমালার শর্ত ভঙ্গ করে দোকানগুলো অন্যের কাছে হস্তান্তর, স্ট্যাম্পে চুক্তি করে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকায় দখলস্বত্ব অন্যের কাছে বিক্রি, দোকানগুলোর মালিকানায় একাধিক হাত বদল, নামে-বেনামে দখলে নেওয়ায় সহ নানান অভিযোগ ওঠে। এতে প্রকৃত ইজারাদার নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। কাগজপত্রকে পাশ কাটিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা মার্কেট দখলে নেন। এ যেন, সরকারি সম্পদ দখলের এক মহোৎসবে মেতে উঠেছে। জেলা পরিষদ মার্কেট এখন লুটের কদু।

লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদ সুত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলা পরিষদের ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যায়ে রামগতি পৌর আলেকজান্ডার বাজারে শতবর্ষী পুকুর দখল করে দোতলা ও টিনসেট বিশিষ্ট দুইটি মার্কেট নির্মাণ করে। পাকা ভবনে ৫৩, টিনশিট মার্কেটে ৩২ টি মিলে মোট ৮৫ টি দোকান  তৈরী করা হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শেষে পরিষদের নীতিমালা উপেক্ষা করে দলীয় বিবেচনায় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পছন্দের লোকজনের মাঝে দোকানগুলো বন্টন করা হয়। এ ক্ষেত্রে দোকান বরাদ্দের কোন নীতিমালা মানা হয়নি। যে কারণে একজনের নামে একাধিক দোকান, আবার এক পরিবারের স্বামী, স্ত্রী, ভাই- বোন ও ছেলের নামেও দোকান রয়েছে।

নীতিমালায় বলা হয় , দোকান বরাদ্দ দেওয়ার আগে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বরাদ্দের জন্য দরপত্রের আহবান করবে। পরে যাচাই বাচাই করে প্রকৃত অসহায় ও গরিব ব্যবসায়ীদেরকে মাসিক ১ হাজার ২৫০ টাকা ইজারা ফি পরিশোধ করে এক বছরের জন্য (একসনা) বন্দোবস্ত দিবেন।  প্রতি বছর বন্দোবস্ত নবায়ন করতে হবে। এসব নীতিমালার কোন তোয়াক্কা না করে সম্পুর্ন রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রভাবশালীদের থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে স্টাম্পের মাধ্যমে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে তারা ওই দোকান বেশী দামে অন্যের কাছে বিক্রি করে। এতে একেকটি দোকান কয়েকবার বিক্রি করা হয়।

জেলা পরিষদের একাধিক সুত্র ও স্থানীয়রা জানান, মার্কেট নির্মাণ ও দোকান বরাদ্দের সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন জেলা পরিষদের তৎকালীন সদস্য ও আলেকজান্ডার ইউনিয়ন আ. লীগের সভাপতি আমজাদ হোসেন। তিনি মার্কেট নির্মাণ ও দোকান বরাদ্দের নামে সাধারণ মানুষ থেকে অন্তত ৫ থেকে ৮ কোটি টাকার বাণিজ্য করেন বলে অভিযোগ উঠে। কয়েকটি দোকানের ভাড়া নিচ্ছেন আমজাদের স্ত্রী নাজনে আরা রিতাও।  সরেজমিনে মার্কেট ঘুরে দেকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

আমজাদ হোসেনকে ঘিরে জেলা পরিষদের দোকান দখল, নামে-বেনামে বরাদ্দ, কথিত ভুয়া কাগজপত্র তৈরি, স্ট্যাম্পের মাধ্যমে দোকান হস্তান্তর ও তৃতীয় পক্ষের কাছে দোকান বিক্রির অভিযোগ এখন সবার মুখে মুখে। মার্কেটের ৮৫ দোকানের মধ্যে প্রায় ৮০  দোকান হাতবদল হয়ে একাধিকবার বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। একজনের দখলে একাধিক দোকান, একজনের দোকান অন্যজনে ভাড়া তোলারও অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে ওই মার্কেট এখন জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে নেই। এটি দখলবাজদের কবজায় চলে গেছে বলে জানান স্থানীয়রা।

এদিকে জেলা পরিষদ কার্যালয়ে মার্কেট নির্মাণ সংক্রান্ত ব্যায়ের কাগজপত্র থাকলেও দোকান ইজারা (বরাদ্দ) নেওয়া ব্যবসায়ীদের কোন তালিকা সংরক্ষিত নেই। ফলে প্রকৃত বরাদ্দপ্রাপ্তদের নামের তালিকাও জানা যায়নি। যে কারণে ৫ আগস্টের পর ২ বছরের বেশী জেলা পরিষদের ফান্ডে মার্কেট থেকে কোন রাজস্ব জমা হয়নি বলে জানা গেছে।

আলেকজান্ডার বাজারের অন্তত ১০ জন ব্যবসায়ী জানান, জেলা পরিষদের নীতিমালা উপেক্ষা করে আমজাদ হোসেন স্ট্যাম্পের মাধ্যমে পজিশনভেদে প্রতিটি দোকান থেকে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করেন। জেলা পরিষদের রসিদ ছাড়াই নগদে টাকা নিয়েছেন আমজাদ। মার্কেটের ৮৫ দোকান থেকে প্রায় ৫ থেকে ৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। যদিও আমজাদের দাবি, এসব টাকা তিনি মার্কেট নির্মাণে ব্যয় করেছেন।  অভিযোগ রয়েছে, হাতিয়ে নেওয়া টাকা আমজাদ ও জেলা পরিষদের তখনকার কর্তাব্যক্তিরা ভাগাভাগির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন। জেলা পরিষদ মার্কেট সরকারি সম্পত্তি হলেও বর্তমানে কিছু ব্যক্তি নিজেদের পারিবারিক সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছে।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ২৩ জুলাই লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের নব নিযুক্ত প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাহাব উদ্দিন সাবু সরেজমিনে এসে আলেকজান্ডার বাজারের ওই মার্কেটটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে ব্যবসায়ী ও ভাড়াটিয়াদের সাথে কথা বলে অভিযোগের সত্যতা পান তিনি। তখন ব্যবসায়ীদেরকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কাউকে ভাড়া না দিতে নির্দেশনা দেন তিনি।

স্ট্যাম্পে দোকান বেচাকেনার অভিযোগ:সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্ট্যাম্পে দোকান বেচাকেনা নিয়ে। ভাড়াটিয়ারা জানান, সরকারি দোকানের মালিকানা হস্তান্তরের সুযোগ না থাকলেও ৮০ টির মত দোকান স্টাম্পের মাধ্যমে একাধিকবার হাত বদল (বিক্রি) হয়েছে। এতে মুল মালিক চিহ্নিত করা যাচ্ছেনা। সরকারি সম্পত্তির দখল পরিবর্তন হলেও জেলা পরিষদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন তদারকি নেই। এতে রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ভাড়া তুলছেন অন্যরা, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার?:অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর বেশ কিছু দোকান মালিক পালিয়ে গেলে অন্যরা এসে দোকানগুলো দখলে নিয়ে কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ অন্যজনের কাছে ভাড়া দিয়েছে। বর্তমানে ওই মার্কেটের প্রতিটি দোকানের ভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। ৫ আগস্টের পর থেকে ২ বছরের বেশী মার্কেট থেকে জেলা পরিষদের ফান্ডে কোন টাকা জমা হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন পরিষদ সংশ্লিষ্টরা। এতে বিপুল পরিমাণের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি মার্কেটের দোকানগুলো নিয়মিত পরিদর্শন, ভাড়া আদায় ও বরাদ্দের শর্ত বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন না করলে সরকারি সম্পত্তি ধীরে ধীরে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার হবে।

কাগজপত্র যাচাইয়ের দাবি:স্থানীয়রা বলছেন, জেলা পরিষদের মালিকানাধীন এ মার্কেটের মূল বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম, বর্তমান দখলদার, ভাড়াটিয়া, মাসিক ভাড়া, বকেয়া ভাড়া, দোকান হস্তান্তরের অনুমতি এবং স্ট্যাম্পে কোনো ধরনের লেনদেন হয়েছে কি না-এসব তথ্য প্রকাশ্যে আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরেজমিন পরিদর্শন করে বরাদ্দের শর্ত ভঙ্গ হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা। অনিয়ম প্রমাণিত হলে সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়।

আলেকজান্ডার বাজারের বিসমিল্লাহ ফার্মেসীর মালিক তসলিম জানান, তিনি ১৩ লাখ টাকা দিয়ে আমজাদ থেকে স্টাম্পের মাধ্যমে ২ টি দোকান নিয়েছেন।

মোস্তফা মিয়া জানান, তিনিও আমজাদ থেকে স্টাম্পের মাধ্যমে ১৬ লাখ টাকার বিনিময়ে দুটি দোকান কিনেছেন।

জেলা পরিষদের সাবেক মহিলা সদস্য রোফেনা আক্তার জানান, তিনিও আমজাদ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে স্ট্যাম্প চুক্তির মাধ্যমে ১ টি দোকান ক্রয় করেছেন। তবে বাজারের একমাত্র সরকারি পুকুর দখল করে দোতলা ভবন নির্মাণের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত আমজাদ হোসেন বলেন, তখনকার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের নির্দেশে তিনি মার্কেট নির্মাণের দায়িত্ব নেন। জনগন থেকে নেওয়া টাকা দিয়ে মার্কেট নির্মাণ করেছেন। লুটপাটের অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে এবিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করতে এ প্রতিবেদককে ম্যানেজের লোভ দেখান।

এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী আশরাফুন নাহার বলেন, তিনিও এসব অভিযোগের কথা শুনেছেন। ইতিমধ্যে প্রশাসক মহোদয় মার্কেট পরিদর্শন করে এসেছে।  আমরা অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে নতুন করে টেন্ডারের মাধ্যমে দরপত্র আহবান করে দোকান বরাদ্দের ব্যবস্থা করবো।

জেলা পরিষদের প্রশাসক সাহাব উদ্দিন সাবু বলেন, এ মার্কেটটি জেলা পরিষদের বলা যাচ্ছেনা। কারণ: জেলা পরিষদের ফাইলে মার্কেটের বিস্তারিত কাগজপত্র নেই। বিগত স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সময়ে অবৈধ ভাবে মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে কোন ধরনের স্টিমেট, টেন্ডার, নকশা ও মন্ত্রনালয়ের অনুমোদন।নেওয়া হয়নি। 

সম্পুর্ন নিয়মবহির্ভূত এটি করা হয়। দোকান ঘর দেওয়ার কথা বলে লোকজন থেকে কয়েক কোটি  টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও আমরা পেয়েছি। একেকজনের দখলে ৫ থেকে ১০ টি পর্যন্ত দোকান রয়েছে। এটা কোনো নিয়মের ভিতরে পড়ে?। যারা এ মার্কেট নির্মাণের সাথে জড়িত থেকে এ ধরনের মহা বাণিজ্য করেছে, দোকান বিক্রি করেছে, তাদেরকে আইনের আওতা আনা হবে। এখন যারা মার্কেট দখল করে আছে, তাদের সবাইকে সরিয়ে দেওয়া হবে। আমি কিছুদিন আগে মার্কেটটি পরিদর্শনে গিলে এসব অনিয়মের কথা শুনে অবাক হয়েছি। অনিয়ম বা লুটপাটেরও একটা সীমা থাকা উচিত। 

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


রামগতিতে জেলা পরিষদ মার্কেটের দোকান দখল-বেচাকেনার হিড়িক

প্রকাশের তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে জেলা পরিষদের মালিকানাধীন মার্কেট দখল ও চড়া দামে বেচাকেনার অভিযোগ উঠেছে দখলদারদের বিরুদ্ধে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানার মতো ব্যাবহার, ভাড়া দেওয়া, হাতবদল ও স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে রাজস্ব ফাঁকি ও সরকারের অন্তত অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে। বর্তমানে ওই মার্কেট জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে নেই। এটি দখলবাজদের কবজায় রয়েছে।

অভিযোগ ওঠেছে , জেলা পরিষদের নীতিমালার শর্ত ভঙ্গ করে দোকানগুলো অন্যের কাছে হস্তান্তর, স্ট্যাম্পে চুক্তি করে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকায় দখলস্বত্ব অন্যের কাছে বিক্রি, দোকানগুলোর মালিকানায় একাধিক হাত বদল, নামে-বেনামে দখলে নেওয়ায় সহ নানান অভিযোগ ওঠে। এতে প্রকৃত ইজারাদার নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। কাগজপত্রকে পাশ কাটিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা মার্কেট দখলে নেন। এ যেন, সরকারি সম্পদ দখলের এক মহোৎসবে মেতে উঠেছে। জেলা পরিষদ মার্কেট এখন লুটের কদু।

লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদ সুত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলা পরিষদের ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যায়ে রামগতি পৌর আলেকজান্ডার বাজারে শতবর্ষী পুকুর দখল করে দোতলা ও টিনসেট বিশিষ্ট দুইটি মার্কেট নির্মাণ করে। পাকা ভবনে ৫৩, টিনশিট মার্কেটে ৩২ টি মিলে মোট ৮৫ টি দোকান  তৈরী করা হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শেষে পরিষদের নীতিমালা উপেক্ষা করে দলীয় বিবেচনায় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পছন্দের লোকজনের মাঝে দোকানগুলো বন্টন করা হয়। এ ক্ষেত্রে দোকান বরাদ্দের কোন নীতিমালা মানা হয়নি। যে কারণে একজনের নামে একাধিক দোকান, আবার এক পরিবারের স্বামী, স্ত্রী, ভাই- বোন ও ছেলের নামেও দোকান রয়েছে।

নীতিমালায় বলা হয় , দোকান বরাদ্দ দেওয়ার আগে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বরাদ্দের জন্য দরপত্রের আহবান করবে। পরে যাচাই বাচাই করে প্রকৃত অসহায় ও গরিব ব্যবসায়ীদেরকে মাসিক ১ হাজার ২৫০ টাকা ইজারা ফি পরিশোধ করে এক বছরের জন্য (একসনা) বন্দোবস্ত দিবেন।  প্রতি বছর বন্দোবস্ত নবায়ন করতে হবে। এসব নীতিমালার কোন তোয়াক্কা না করে সম্পুর্ন রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রভাবশালীদের থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে স্টাম্পের মাধ্যমে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে তারা ওই দোকান বেশী দামে অন্যের কাছে বিক্রি করে। এতে একেকটি দোকান কয়েকবার বিক্রি করা হয়।

জেলা পরিষদের একাধিক সুত্র ও স্থানীয়রা জানান, মার্কেট নির্মাণ ও দোকান বরাদ্দের সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন জেলা পরিষদের তৎকালীন সদস্য ও আলেকজান্ডার ইউনিয়ন আ. লীগের সভাপতি আমজাদ হোসেন। তিনি মার্কেট নির্মাণ ও দোকান বরাদ্দের নামে সাধারণ মানুষ থেকে অন্তত ৫ থেকে ৮ কোটি টাকার বাণিজ্য করেন বলে অভিযোগ উঠে। কয়েকটি দোকানের ভাড়া নিচ্ছেন আমজাদের স্ত্রী নাজনে আরা রিতাও।  সরেজমিনে মার্কেট ঘুরে দেকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

আমজাদ হোসেনকে ঘিরে জেলা পরিষদের দোকান দখল, নামে-বেনামে বরাদ্দ, কথিত ভুয়া কাগজপত্র তৈরি, স্ট্যাম্পের মাধ্যমে দোকান হস্তান্তর ও তৃতীয় পক্ষের কাছে দোকান বিক্রির অভিযোগ এখন সবার মুখে মুখে। মার্কেটের ৮৫ দোকানের মধ্যে প্রায় ৮০  দোকান হাতবদল হয়ে একাধিকবার বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। একজনের দখলে একাধিক দোকান, একজনের দোকান অন্যজনে ভাড়া তোলারও অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে ওই মার্কেট এখন জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে নেই। এটি দখলবাজদের কবজায় চলে গেছে বলে জানান স্থানীয়রা।

এদিকে জেলা পরিষদ কার্যালয়ে মার্কেট নির্মাণ সংক্রান্ত ব্যায়ের কাগজপত্র থাকলেও দোকান ইজারা (বরাদ্দ) নেওয়া ব্যবসায়ীদের কোন তালিকা সংরক্ষিত নেই। ফলে প্রকৃত বরাদ্দপ্রাপ্তদের নামের তালিকাও জানা যায়নি। যে কারণে ৫ আগস্টের পর ২ বছরের বেশী জেলা পরিষদের ফান্ডে মার্কেট থেকে কোন রাজস্ব জমা হয়নি বলে জানা গেছে।

আলেকজান্ডার বাজারের অন্তত ১০ জন ব্যবসায়ী জানান, জেলা পরিষদের নীতিমালা উপেক্ষা করে আমজাদ হোসেন স্ট্যাম্পের মাধ্যমে পজিশনভেদে প্রতিটি দোকান থেকে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করেন। জেলা পরিষদের রসিদ ছাড়াই নগদে টাকা নিয়েছেন আমজাদ। মার্কেটের ৮৫ দোকান থেকে প্রায় ৫ থেকে ৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। যদিও আমজাদের দাবি, এসব টাকা তিনি মার্কেট নির্মাণে ব্যয় করেছেন।  অভিযোগ রয়েছে, হাতিয়ে নেওয়া টাকা আমজাদ ও জেলা পরিষদের তখনকার কর্তাব্যক্তিরা ভাগাভাগির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন। জেলা পরিষদ মার্কেট সরকারি সম্পত্তি হলেও বর্তমানে কিছু ব্যক্তি নিজেদের পারিবারিক সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছে।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ২৩ জুলাই লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের নব নিযুক্ত প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাহাব উদ্দিন সাবু সরেজমিনে এসে আলেকজান্ডার বাজারের ওই মার্কেটটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে ব্যবসায়ী ও ভাড়াটিয়াদের সাথে কথা বলে অভিযোগের সত্যতা পান তিনি। তখন ব্যবসায়ীদেরকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কাউকে ভাড়া না দিতে নির্দেশনা দেন তিনি।

স্ট্যাম্পে দোকান বেচাকেনার অভিযোগ:সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্ট্যাম্পে দোকান বেচাকেনা নিয়ে। ভাড়াটিয়ারা জানান, সরকারি দোকানের মালিকানা হস্তান্তরের সুযোগ না থাকলেও ৮০ টির মত দোকান স্টাম্পের মাধ্যমে একাধিকবার হাত বদল (বিক্রি) হয়েছে। এতে মুল মালিক চিহ্নিত করা যাচ্ছেনা। সরকারি সম্পত্তির দখল পরিবর্তন হলেও জেলা পরিষদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন তদারকি নেই। এতে রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ভাড়া তুলছেন অন্যরা, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার?:অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর বেশ কিছু দোকান মালিক পালিয়ে গেলে অন্যরা এসে দোকানগুলো দখলে নিয়ে কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ অন্যজনের কাছে ভাড়া দিয়েছে। বর্তমানে ওই মার্কেটের প্রতিটি দোকানের ভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। ৫ আগস্টের পর থেকে ২ বছরের বেশী মার্কেট থেকে জেলা পরিষদের ফান্ডে কোন টাকা জমা হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন পরিষদ সংশ্লিষ্টরা। এতে বিপুল পরিমাণের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি মার্কেটের দোকানগুলো নিয়মিত পরিদর্শন, ভাড়া আদায় ও বরাদ্দের শর্ত বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন না করলে সরকারি সম্পত্তি ধীরে ধীরে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার হবে।

কাগজপত্র যাচাইয়ের দাবি:স্থানীয়রা বলছেন, জেলা পরিষদের মালিকানাধীন এ মার্কেটের মূল বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম, বর্তমান দখলদার, ভাড়াটিয়া, মাসিক ভাড়া, বকেয়া ভাড়া, দোকান হস্তান্তরের অনুমতি এবং স্ট্যাম্পে কোনো ধরনের লেনদেন হয়েছে কি না-এসব তথ্য প্রকাশ্যে আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরেজমিন পরিদর্শন করে বরাদ্দের শর্ত ভঙ্গ হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা। অনিয়ম প্রমাণিত হলে সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়।

আলেকজান্ডার বাজারের বিসমিল্লাহ ফার্মেসীর মালিক তসলিম জানান, তিনি ১৩ লাখ টাকা দিয়ে আমজাদ থেকে স্টাম্পের মাধ্যমে ২ টি দোকান নিয়েছেন।

মোস্তফা মিয়া জানান, তিনিও আমজাদ থেকে স্টাম্পের মাধ্যমে ১৬ লাখ টাকার বিনিময়ে দুটি দোকান কিনেছেন।

জেলা পরিষদের সাবেক মহিলা সদস্য রোফেনা আক্তার জানান, তিনিও আমজাদ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে স্ট্যাম্প চুক্তির মাধ্যমে ১ টি দোকান ক্রয় করেছেন। তবে বাজারের একমাত্র সরকারি পুকুর দখল করে দোতলা ভবন নির্মাণের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত আমজাদ হোসেন বলেন, তখনকার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের নির্দেশে তিনি মার্কেট নির্মাণের দায়িত্ব নেন। জনগন থেকে নেওয়া টাকা দিয়ে মার্কেট নির্মাণ করেছেন। লুটপাটের অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে এবিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করতে এ প্রতিবেদককে ম্যানেজের লোভ দেখান।

এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী আশরাফুন নাহার বলেন, তিনিও এসব অভিযোগের কথা শুনেছেন। ইতিমধ্যে প্রশাসক মহোদয় মার্কেট পরিদর্শন করে এসেছে।  আমরা অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে নতুন করে টেন্ডারের মাধ্যমে দরপত্র আহবান করে দোকান বরাদ্দের ব্যবস্থা করবো।

জেলা পরিষদের প্রশাসক সাহাব উদ্দিন সাবু বলেন, এ মার্কেটটি জেলা পরিষদের বলা যাচ্ছেনা। কারণ: জেলা পরিষদের ফাইলে মার্কেটের বিস্তারিত কাগজপত্র নেই। বিগত স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সময়ে অবৈধ ভাবে মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে কোন ধরনের স্টিমেট, টেন্ডার, নকশা ও মন্ত্রনালয়ের অনুমোদন।নেওয়া হয়নি। 

সম্পুর্ন নিয়মবহির্ভূত এটি করা হয়। দোকান ঘর দেওয়ার কথা বলে লোকজন থেকে কয়েক কোটি  টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও আমরা পেয়েছি। একেকজনের দখলে ৫ থেকে ১০ টি পর্যন্ত দোকান রয়েছে। এটা কোনো নিয়মের ভিতরে পড়ে?। যারা এ মার্কেট নির্মাণের সাথে জড়িত থেকে এ ধরনের মহা বাণিজ্য করেছে, দোকান বিক্রি করেছে, তাদেরকে আইনের আওতা আনা হবে। এখন যারা মার্কেট দখল করে আছে, তাদের সবাইকে সরিয়ে দেওয়া হবে। আমি কিছুদিন আগে মার্কেটটি পরিদর্শনে গিলে এসব অনিয়মের কথা শুনে অবাক হয়েছি। অনিয়ম বা লুটপাটেরও একটা সীমা থাকা উচিত। 


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত