প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুলাই ২০২৬
কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের গবাদিপশু পালন হচ্ছে আয়ের উৎস
বন্যা, নদীভাঙন, খরা আর অনিশ্চিত কৃষির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের কাছে গবাদিপশু পালন এখন জীবিকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অবলম্বন হয়ে উঠেছে। ফসলহানির ঝুঁকিতে থাকা হাজারো পরিবার গরু-ছাগল- হাঁস - মুরগি পালন করে সংসারে ফিরিয়ে আনছে স্বচ্ছলতা, কমছে দারিদ্র্য।কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও পরিবেশবিদ মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত এক দশকে বন্যা ও নদীভাঙনের প্রকোপ প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নদীভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চরাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গবাদিপশু পালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেওসমান গনী বলেন, গরু পালন এতটাই লাভজনক যে প্রয়োজনে ঋণ নিলেও গরু বিক্রি করে সহজেই তা পরিশোধ করা যায়।তিনি বলেন, একটি গরুর বাছুর এক বছর পর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। আমার মতো পরিবারের জন্য এটি বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা।জেলার বিভিন্ন এনজিও সূত্রে জানা গেছে, পশুপালনের জন্য বীমা সুবিধা রয়েছে। মাত্র ১২ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হয়। কোনো কারণে বীমাকৃত পশুর ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়।জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কুড়িগ্রামে বর্তমানে গরুর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ২৩ হাজার, মহিষ ১১ হাজার, ছাগল ৭ লাখ ৪৫ হাজার, ভেড়া ১ লাখ ৪৯ হাজার এবং ঘোড়া রয়েছে ৩ হাজার ২১৬টি। এর মধ্যে চরাঞ্চলেই গবাদিপশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।বর্ষা ও বন্যার সময় গবাদিপশুর ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। তাই বিশুদ্ধ পানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন খাদ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি পশুর স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর রাখার পরামর্শ দেন তিনি।তিনি আরও বলেন, জুন ও জুলাই মাসে এ অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বেশি থাকে। নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রমের সম্ভাবনা দেখা দিলে আগেই গবাদিপশুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। অন্যদিকে খরার মৌসুমে খড় ও ঘাস মজুত রাখতে হবে। গবাদিপশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার সুযোগও সবসময় রয়েছে।সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য রহিম উদ্দিন হায়দার রিপন বলেন, চরাঞ্চলের মানুষ প্রথমে ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বন্যার পূর্বাভাস পান। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন এনজিও এবং ভয়েস কলের মাধ্যমেও তথ্য পৌঁছে যায়। সাধারণত তারা ৫ থেকে ১০ দিনের বন্যার পূর্বাভাস পেয়ে থাকেন।জেলার ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, ফুলকুমার ও জিঞ্জিরামসহ ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় প্রায় সাড়ে চারশ' চর রয়েছে। এসব চরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস।উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউননিয়নের মোল্পোহাট চরের বাসিন্দা মোঃ মোকলেছুর রহমান বলেন, চরে কৃষি আবাদ করে খুব একটা লাভ হয় না। তাই গরু - ছাগল কিনে এনে পালন করি। এখন চারটি গরু রয়েছে।ছাগল আছে ৫ টি। বছরে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হয়। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর ঘাস জন্মায়। ফলে গরু-ছাগল পালনে খাদ্য ব্যয় কম হয় এবং খামারিরা লাভবান হন। প্রাণিসম্পদ বিভাগ নিয়মিত চিকিৎসা, টিকাদান ও কারিগরি পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। তিনি চরাঞ্চলের মানুষকে গবাদিপশু পালনে আরও বেশি আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানান।
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত