প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয় অর্থনীতি সুরক্ষায় নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্র রুখতে হবে
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় সোপান এবং কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ঠিকানা তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) শিল্প আজ এক গভীর ও উদ্বেগজনক সংকটের মুখোমুখি। মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সাম্প্রতিক অসন্তুষ্টি, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়; বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করার একটি সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের অংশ কি না, তা আজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন এবং মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। বিজিএমইএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩৮.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সুতা, কাপড়, ডাইং, ওয়াশিং, পরিবহন, ব্যাংকিং ও প্যাকেজিংয়ের মতো অসংখ্য সহায়ক শিল্পের জীবিকাও এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গ্রাম থেকে শহরে আসা নারী শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে এ শিল্পের ভূমিকা ঐতিহাসিক। ফলে এই খাতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তার নেতিবাচক অভিঘাত পড়বে গোটা জাতীয় অর্থনীতিতে।বিশ্ববাজারের মন্দা, জ্বালানি সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতির কারণে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রা আজ চরম কঠিন হয়ে উঠেছে। বর্তমান বাস্তবতায় তাদের ন্যায্য জীবনমান এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবি শতভাগ যৌক্তিক। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর হওয়া সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি কাঠামো অনুযায়ী পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি উঠেছে। শ্রমিকের ঘাম ও শ্রমের বিনিময়ে শিল্পের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হলে সেই প্রবৃদ্ধির সুফল শ্রমিকের জীবনেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের একটি স্বাধীন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, যেখানে শ্রমিক, মালিক, সরকার ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রয়েছে। সংকট নিরসনে শ্রম মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন থামেনি। ৩ নভেম্বর বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের মালিকপক্ষ প্রায় ৭০০টি কারখানা বন্ধ বা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং সংঘর্ষের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।গোয়েন্দা তথ্য ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংবাদচিত্র থেকে স্পষ্ট যে, এই আন্দোলনের নেপথ্যে তৃতীয় পক্ষের গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে। বিশেষ করে, দেশ ও রাষ্ট্রবিরোধী চক্র কিংবা রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে পতিত ফ্যাসিবাদের দোসররা এই শিল্প খাতকে অস্থিতিশীল করতে বহিরাগতদের নানাভাবে উসকে দিচ্ছে। কারখানার ভেতরে হামলা, পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ প্রমাণ করে যে, এই আন্দোলনটি আর কেবল শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর পেছনে রয়েছে অন্তর্ঘাতমূলক রাজনৈতিক এজেন্ডা। শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং পরিকল্পিত নাশকতা কখনো এক বিষয় হতে পারে না।সরকারের সামনে এখন দ্বিমুখী দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের আস্থা ফিরিয়ে এনে আলোচনার মাধ্যমে মজুরি সমস্যার সমাধান করতে হবে, অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর বৈঠকে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এ উদ্যোগকে কার্যকর করতে শ্রম মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে কারখানা বন্ধ, শ্রমিক ছাঁটাই, বকেয়া বেতন ও হয়রানির অভিযোগেরও দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। শ্রমিকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করে জীবনযাত্রার ব্যয়, উৎপাদনশীলতা, শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা বিবেচনায় নিয়ে সময়সীমাবদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজনে ধাপে ধাপে মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও খাদ্য সহায়তার মতো সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। অন্যদিকে কারখানা মালিকদেরও মনে রাখতে হবে, শ্রমিক অসন্তোষকে অবহেলা করে কেবল উৎপাদন ও মুনাফা বাড়ানোর নীতি দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের জন্য বিপজ্জনক।আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতাও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ, শ্রমিক অধিকার, পরিবেশগত মান এবং উৎপাদন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক ক্রয় কার্যাদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার মারাত্মক প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রা আয়, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং পণ্যের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এই খাতকে সুরক্ষা দিতে হবে।সর্বোপরি, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি শিল্পকারখানা ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা করাও সরকারের প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। যারা শ্রমিক অসন্তোষকে পুঁজি করে অর্থনৈতিক নাশকতার চেষ্টা করবে, তাদের পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনতে হবে। পোশাকশিল্প শুধু কোনো ব্যবসা নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শ্রমিক, মালিক ও সরকারের পারস্পরিক আস্থা, দায়িত্বশীলতা এবং সহযোগিতার মাধ্যমেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। কোনো ষড়যন্ত্র বা নৈরাজ্যের কাছে জাতীয় অর্থনীতিকে জিম্মি হতে দেওয়া যাবে না—শিল্প বাঁচলে কর্মসংস্থান বাঁচবে, রপ্তানি বাঁচবে, আর তবেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।E-mail: msislam.sumon@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত