প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬
টাকা চাই না, মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই: রাজশাহীর বস্তিবাসীর আকুতি
"আমরা টাকা-পয়সা চাই না, ৪২টি পরিবারের জন্য একটু আশ্রয়ের ব্যবস্থা করুন। আমরা শুধু পরিবার নিয়ে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই।" আবেগাপ্লুত ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাজশাহীর বুধপাড়া রেলওয়ে বস্তির বাসিন্দা জাহেদা বেগমের এই আকুতির মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে নগরীর শত শত বস্তিবাসীর চরম অনিশ্চয়তা ও জীবনসংগ্রামের চিত্র।আগামী ৩১ অক্টোবর 'বিশ্ব নগর দিবস' উপলক্ষে বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজশাহী নগরীর একটি রেস্তোরাঁর সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে বক্তা ও বস্তিবাসীরা এই দাবি তুলে ধরেন। 'শহরের পুনরুজ্জীবন: সকলের জন্য পর্যাপ্ত বাসস্থান' শীর্ষক এই সংলাপের আয়োজন করে উন্নয়ন সংস্থা 'বারসিক'।সংলাপে উঠে আসে, রাজশাহী নগরীর অন্তত ১০৪টি বস্তিতে বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষের জীবনে নিরাপদ বাসস্থানের কোনো নিশ্চয়তা নেই। নগরীর শ্রমজীবী মানুষ—যারা রিকশা চালান, রাজমিস্ত্রি বা গৃহস্থালির কাজ করে শহরকে সচল রাখেন, তাঁদের বস্তিতে নেই কোনো সুপেয় পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা শিশুদের খেলার মাঠ। উল্টো বর্ষার পানিতে প্লাবিত হওয়া, সাপ-পোকামাকড়ের উপদ্রব এবং যেকোনো মুহূর্তে উচ্ছেদের আতঙ্কের মধ্যে তাঁদের দিন কাটাতে হয়। চৌদ্দপাই বস্তির বাসিন্দা পাপিয়া সুলতানা ও বহরমপুর বস্তির মো. মতিয়ার শেখ অভিযোগ করে বলেন, ভোটের সময় তাঁদের নাগরিকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও পরবর্তীতে পুনর্বাসন বা মৌলিক সুবিধার কোনো খোঁজ নেওয়া হয় না।সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), রাজশাহী জেলার সভাপতি আহমেদ সফিউদ্দিন বলেন, "বস্তিবাসীকে বাদ দিয়ে কোনো টেকসই নগর গঠন সম্ভব নয়। উন্নয়নের নামে উচ্ছেদের আগে অবশ্যই পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।" তিনি সরকারি খাসজমি চিহ্নিত করে বস্তিবাসীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন প্রকল্প গ্রহণ বা গৃহনির্মাণ ঋণের ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানান। এছাড়া রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে (রাসিক) একটি বিশেষ 'গবেষণা সেল' গঠন করে নগরীর শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত তথ্য সংগ্রহের আহ্বান জানান তিনি।স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'ছোট্ট স্বপ্ন'-এর সাধারণ সম্পাদক মো. রকি আলী এবং সামাজিক স্কুলের সাধারণ সম্পাদক ফাতেমা-তুজ-জোহরা বলেন, নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে আশ্রয় নেওয়া এই মানুষগুলোকে না জানিয়ে হঠাৎ উচ্ছেদ করা অমানবিক। উচ্ছেদ বন্ধ করে তাদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাসিক, আরডিএ এবং স্থানীয় সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।নগর দরিদ্র অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব নিলুফার ইসমত আরার সভাপতিত্বে আয়োজিত সংলাপে বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমানের সঞ্চালনায় মূল গবেষণা নীতিপত্র উপস্থাপন করেন বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ও নৃবিজ্ঞানী মো. শহিদুল ইসলাম।সংলাপে আরও বক্তব্য দেন রুলফাওয়ের নির্বাহী পরিচালক আফজাল হোসেন, নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী, রাসিকের নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সাকিবুর রহমান এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মাহিদুর রহমানসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ। সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা সর্বসম্মতভাবে করুণা নয়, বরং নাগরিক হিসেবে আবাসন ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের দাবি জানান।
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত