প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬
পুরুষেরা বাইরে,নারীদের পদচারণায় মুখর ঐতিহ্যবাহী বউমেলা
মেলার প্রধান ফটকের সামনে একের পর এক থামছে মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, অটোরিকশা ও চার্জার ভ্যান। স্বামী, ভাই কিংবা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে মেলায় আসছেন নারীরা। ফটকে স্ত্রী-সন্তানদের নামিয়ে দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছেন পুরুষেরা। আর মেলার ভেতরে চলছে নারীদের কেনাকাটা, ঘোরাঘুরি ও আনন্দ-উচ্ছ্বাস। এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘বউমেলা’।সোমবার (২৬ অক্টোবর) ফুলবাড়ী উপজেলার সুজাপুর সার্বজনীন দুর্গামন্দির প্রাঙ্গণে বসে এ মেলা। দীর্ঘ প্রায় ৭০ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে প্রতিবছর লক্ষ্মীপূজার পরদিন এ মেলার আয়োজন করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে মেলায় দর্শনার্থী হিসেবে শুধু নারী ও শিশুরা প্রবেশের সুযোগ পান। পুরুষদের থাকতে হয় মেলার বাইরে।সরেজমিনে দেখা যায়, মেলার ভেতরে সারি সারি দোকানে সাজানো রয়েছে নারীদের প্রসাধনী, শিশুদের খেলনা, গৃহস্থালির তৈজসপত্র, ঘর সাজানোর সামগ্রী, হস্তশিল্প ও বাহারি খাবার। পছন্দের পণ্য কিনতে দোকানে দোকানে ভিড় করছেন নারীরা। শিশুদের মধ্যেও দেখা যায় ব্যাপক উচ্ছ্বাস। দুপুরের পর থেকে জমে ওঠা মেলায় সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে কেনাকাটা ও ঘোরাঘুরি।মেলার বিশেষত্ব হলো, নারীদের জন্য নির্ধারিত সময়ে পুরুষ দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তবে দোকান পরিচালনা ও পণ্য বিক্রির কাজে পুরুষ ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ রয়েছে। অন্যদিকে, মেলার প্রধান ফটকের বাইরে অপেক্ষমাণ পুরুষদের কেউ গল্প করছেন পরিচিতজনদের সঙ্গে, কেউবা অপেক্ষা করছেন স্ত্রী-সন্তানদের কেনাকাটা শেষ হওয়ার জন্য।মেলায় আসা আশা রানী বলেন, এই মেলা আমাদের নারীদের জন্য। তাই এখানে এলে আলাদা একটা অনুভূতি কাজ করে। দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনও আসেন। মেলায় অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, ভাববিনিময় হয়। মেলা মানেই মিলনস্থল।বিউটি সরকার বলেন, আমরা অনেক কিছু কেনাকাটা করেছি। এই মেলায় আসতে ভালো লাগে। কোনো ধরনের সমস্যা হয় না। এক কথায়, সারা বছর এই মেলার জন্য অপেক্ষায় থাকি। তবে আমার স্বামীকে বাইরে রেখে আসতে হয়েছে।বালা রানী দাস বলেন, এটি শুধু মেয়েদের জন্য আয়োজন করা হয়। এখানে মেয়েদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, এটা ভেবে গর্ববোধ করছি। দাদার সঙ্গে এসেছি। তিনি বাইরে আছেন, আমাকে নিয়ে আবার বাড়িতে যাবেন।স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে মেলায় এসেছেন শিবেন সরকার। তিনি বলেন, তাঁদের ভেতরে দিয়ে আমি বাইরে অপেক্ষা করছি। আমরা যারা পুরুষ আছি, তারাও এই মেলা বেশ উপভোগ করি। কোনো রকম ঝুট-ঝামেলা নেই।অরুণ রায় বলেন, আমরা মেলায় একপ্রকার পাহারা দিই, যাতে বাইরের কোনো পুরুষ ভেতরে প্রবেশ করতে না পারেন। এই একটি দিন নারীদের স্বাধীনভাবে মেলায় প্রবেশ করে ইচ্ছেমতো ঘোরার সুযোগ থাকে। তাঁদের প্রাধান্য দিতে পেরে আমাদেরও ভালো লাগে।মেলার ব্যবসায়ী হরমুজ আলী বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে এই মেলায় হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করি। দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত শুধু নারীরা প্রবেশ করতে পারেন। রাতে সবার জন্য মেলা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ছোট পরিসরে হলেও মেলাটির পরিবেশ সুন্দর।সুজাপুর সার্বজনীন দুর্গাপূজা ও বউমেলার সাধারণ সম্পাদক সুজন সরকার বলেন, প্রায় ৭০ বছর ধরে এই বউমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। জমিদার ক্ষিতীশ সরকার রায়ের সময় চাঁদপাড়ায় এ মেলার আয়োজন করা হতো। তখন দুর্গামন্দিরটিও সেখানে অবস্থিত ছিল। দুর্গাপূজার পাঁচ দিন পর লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। লক্ষ্মীপূজার পরদিন বসে ঐতিহ্যবাহী এই বউমেলা।তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আমরা ধরে রেখেছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে চাই।প্রায় সাত দশক ধরে চলে আসা এই বউমেলা এখন শুধু কেনাকাটার আয়োজন নয়, বরং নারীদের মিলনমেলা ও স্থানীয় ঐতিহ্যের অংশ। বছরে একটি দিন নিজেদের মতো করে মেলা ঘুরে দেখা, পছন্দের জিনিস কেনা এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে খুশি স্থানীয় নারীরা। আর মেলার বাইরে অপেক্ষা করেও সেই আনন্দের অংশীদার হচ্ছেন পরিবারের পুরুষ সদস্যরা।
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত