প্রকাশের তারিখ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬
দিনাজপুরে যে মেলায় জীবনসঙ্গী খোঁজার গল্প প্রচলিত, বাস্তবতা ভিন্ন
দিনাজপুরের বীরগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মিলন মেলা। শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ মেলাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে নানা গল্প। এর মধ্যে অন্যতম, এ মেলায় নাকি পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজে নেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা। তবে প্রচলিত এ ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। তাঁদের ভাষ্য, মেলাটি মূলত আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক সম্প্রীতির মিলনমেলা।শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দিনব্যাপী এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী-পুরুষসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।সকাল থেকেই মেলায় আসতে শুরু করেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে প্রবীণদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ। ঐতিহ্যবাহী পোশাক, সাজসজ্জা, গান-বাজনা আর মানুষের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে মেলাটি পরিণত হয় এক বর্ণিল মিলনমেলায়।স্থানীয় নিজপাড়া ও মোহনপুর ইউনিয়নের আয়োজনে এবং গোলাপগঞ্জ দুর্গাপূজা উদ্যাপন কমিটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ মেলার আয়োজন করা হয়।মেলাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে বহু বছর ধরে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে, এখানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা নিজেদের পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজে নেন। পাত্র-পাত্রীর পছন্দ মিললে বিয়ের কথাবার্তাও এগিয়ে যায় বলে অনেকে মনে করেন। তবে এ ধরনের ধারণার পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।আয়োজকরাও জানিয়েছেন, মেলাটির সঙ্গে বিয়ের আয়োজনের বিষয়টি জড়িত নয়। বীরগঞ্জ আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির আহ্বায়ক যোশেফ হেমরম বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষদের হাত ধরেই এ মেলার সূচনা হয়েছিল। সেই ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা আমরা আজও লালন করছি। প্রতি বছর দুর্গাপূজার পর নিয়মিতভাবে এ মেলার আয়োজন করা হয়। তবে এখানে বিয়ের আয়োজনের বিষয়ে যে কথা প্রচলিত আছে, সেটি সঠিক নয়।মেলায় ঘুরতে আসা দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার আদিবাসী তরুণী শেফালী হেমরম বলেন, এই মেলাটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। প্রতি বছর আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে এখানে আসি। নানা রকম সাজসজ্জা আর গান-বাজনায় অনেক মজা হয়।নীলফামারী থেকে আসা মিলন টুডু বলেন, ছোটবেলা থেকেই এই মেলার কথা শুনে আসছি। এবার নিজ চোখে দেখে খুব ভালো লাগছে। এখানে এসে নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে আবারও একাত্ম হতে পারি।হরিপুর থেকে আসা রবিন মার্ডি বলেন, এটা শুধু একটা মেলা নয়, আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এত মানুষের সমাগম দেখে গর্ব হয়। প্রতি বছর বন্ধুদের নিয়ে আসি। এখানে অনেক পুরোনো পরিচিত মানুষের সঙ্গেও দেখা হয়।মেলাকে কেন্দ্র করে মাঠজুড়ে বসে নানা ধরনের পণ্যের দোকান। বাহারি কাচের চুড়ি, রঙিন ফিতা, লিপস্টিক, কানের দুল, ঝিনুক ও মাটির তৈজসপত্রের পাশাপাশি ছিল খেলনা, দা-কুড়াল, হাঁড়ি-পাতিলসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রীর পসরা।এ ছাড়া স্থানীয় খাবারের দোকানগুলোতেও ছিল ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ভিড়। বিশেষ করে জিলাপি ও মিষ্টির দোকান ঘিরে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।সব মিলিয়ে বীরগঞ্জের এ ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মিলন মেলা পরিণত হয় বিভিন্ন এলাকার মানুষের মিলনকেন্দ্রে। প্রচলিত নানা গল্পের বাইরেও মেলাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনকে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত