প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬
১৭ বছর অন্ধকারে জীবন: দুপচাঁচিয়ার মোকাররমের জীবন-সংগ্রাম
একসময় যার কণ্ঠের তিলাওয়াতে মুখরিত হতো মাদ্রাসার প্রাঙ্গণ, সুরের আলো ছড়াতেন শিক্ষার্থীদের মাঝে,সেই মানুষটির জীবন আজ ১৭ বছর ধরে অন্ধকারের চাদরে ঢাকা। দৃষ্টি হারানোর পর জীবনের গল্পটা এক নিমেষে বদলে গেলেও হার মানেননি তিনি। পেটের তাগিদে, দু’মুঠো ভাতের সংস্থানে ৬৫ বছর বয়সেও হাতে লাঠি আর কাঁধে তালপাখা নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলেন বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার হাফেজ মোঃ মোকাররম হোসেন।উপজেলার সদর ইউনিয়নের ইসলামপুর খাঁ-পাড়া গ্রামের বাসিন্দা হাফেজ মোকাররমের চোখ দুটি যখন ভালো ছিল, তখন তিনি একে একে জিয়ানগর খিদির পাড়া ও পাঁচবিবি বাকিলা মাদ্রাসাসহ মোট পাঁচটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন। মানুষের মনে দ্বীনের আলো জ্বালানোই ছিল তার পেশা ও ব্রত। কিন্তু দীর্ঘ ১৭ বছর আগে এক অজানা অন্ধকারে ঢেকে যায় তার দুটি চোখ। চিরতরে হারিয়ে যায় চোখের আলো।দৃষ্টি হারানোর পর জীবনযুদ্ধ হয়ে পড়ে আরও কঠিন। বয়স আর শারীরিক অক্ষমতাকে তোয়াক্কা না করে বেঁচে থাকার তাগিদে বেছে নেন তালপাখা বিক্রির কাজ। পাইকারি বাজার থেকে বিভিন্ন নকশার তালপাখা কিনে আনেন, তারপর লাঠির ওপর ভর দিয়ে গ্রামের কাঁচা পথ থেকে শুরু করে হাটের পাকা রাস্তায় ঘুরে ঘুরে তা বিক্রি করেন। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দিনশেষে যা উপার্জন হয়, তা দিয়েই কোনোমতে চলে প্রবীণ এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর সংসার।নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে ছলছল চোখে হাফেজ মোকাররম জানান, সরকার থেকে প্রতি তিন মাস পর পর যে প্রতিবন্ধী ভাতা পাই, তা দিয়ে বর্তমানের আকাশছোঁয়া নিত্যপণ্যের বাজারে দিন চালানো অসম্ভব। এর বাইরে আমার আয়ের আর কোনো পথ নেই।একটু অভাবমুক্ত জীবনের আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার যদি আমাকে একটি টিসিবি ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করে দিত, তবে কিছুটা সস্তায় চাল-ডাল কিনে অন্তত দু’মুঠো খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারতাম।প্রতিটি তালপাখার বাতাসের সাথে মিশে থাকে হাফেজ মোকাররমের দীর্ঘশ্বাস আর বেঁচে থাকার নিঃশব্দ লড়াই। জীবনের শেষ অপরাহ্ণে এসে এই প্রবীণ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষক কোনো করুণা চান না; চান শুধু সম্মানের সাথে দু’মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার একটুখানি সরকারি সহযোগিতা।
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত